২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে ছয়টি গুলি করা, নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজনকে হত্যাসহ তিনটি অভিযোগে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রায় বেলা ১১টার পর আজ (২৮ জুন) ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এ উপলক্ষ্যে এ মামলার গ্রেপ্তারকৃত একমাত্র আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে সকাল ৯টার দিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলায় পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন ও গ্রেপ্তার আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন যুক্তি তুলে ধরে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহমেদ, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান, শাইখ মাহাদী ও তারেক আব্দুল্লাহ শুনানিতে অংশ নেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলার পাঁচ আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি ওয়্যারলেসে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন।
এ মামলায় একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। পলাতক রয়েছেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।
গত ৪ মার্চ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু নতুন করে ডিজিটাল এভিডেন্স জমা দেওয়ার আবেদন করে প্রসিকিউশন। এরপর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া আমির হোসেনকে পুনরায় সাক্ষ্য দিতে হয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনটি অভিযোগ এনে পাঁচজন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। তার আগে ৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
অভিযোগ তিনটি হলো— ১. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রামপুরা এলাকায় একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে পিস্তল দিয়ে ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়। ২. বনশ্রী এইচ ব্লকে ছয় বছরের শিশু ঘরের ভেতরে দাদির কোলে বসেছিল। পুলিশের গুলি শিশুর মাথা ভেদ করে দাদি মায়া বেগমের পেটে লাগে। এতে মায়া ইসলাম মারা যান। শিশুটিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে শিশুটি কথা বলতে পারে না। ৩. এ ছাড়া বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নাদিম নামে এক ব্যক্তি।
এ মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষ্য প্রদান করেন। এরমধ্যে ছয়টি গুলি খেয়ে কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেন প্রথম সাক্ষীতে তাকে গুলি করার ঘটনা ও নিহত নাদিমের স্ত্রী মর্মস্পর্শী জবাববন্দি দেন। এছাড়া সাক্ষ্যতে শিশু মুসার মাথা ছিদ্র হয়ে দাদি মায়া ইসলামের পেটে পুলিশের গুলি লাগার পর মৃত্যুর মর্মান্তিক বর্ণনা উঠে এসেছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই বিকেলে রামপুরায় কফিশপ থেকে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের দুই পাশে পুলিশ-বিজিবির গাড়ি দেখে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের ছাদে ওঠেন তিনি। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই নির্মাণাধীন ভবনটির ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন আমির। কিন্তু তাকে দেখে ফেলে পুলিশ। পরে তার ওপর ছয়টি গুলি ছোড়ে এক পুলিশ সদস্য। এতে তিন তলায় পড়ে গেলে তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করেন। এরপর বনশ্রীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরেন ভুক্তভোগী ওই তরুণ। এছাড়া একইদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন। একইসাথে মায়া ইসলামের ছয় বছর বয়সী নাতি বাসিত খান মুসা গুলিবিদ্ধ হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিলেও এখনও কথা বলতে পারছে না এই শিশু।
এ ঘটনায় ভুক্তভুগী পরিবারগুলো ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকারকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল।
২০২৫ সালের ৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরের মাসে ১০ আগস্ট তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৫ আগস্ট পলাতক আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।
২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ হওয়া আমির হোসেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
ওইদিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান তিনি। এরপর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন চঞ্চল। ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।