যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পর কোন পথে ইরান-মার্কিন আলোচনা

পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দেওয়া এই ঘোষণায় যুদ্ধবিরতি কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তারিখ উল্লেখ করেননি তিনি।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, তা এখনও সংলাপের গতি তৈরি করতে পারেনি। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগামী ও বন্দর ত্যাগকারী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা নতুন করে আলোচনায় বসবে না। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি এবং স্থবির হয়ে পড়া কূটনীতি, এই দুইয়ের বৈপরীত্য বর্তমান পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকেই সামনে আনছে।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: কেন তেহরান আলোচনায় যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে? চাপ বজায় রেখে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর পেছনে ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এবং পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে?

কেন আলোচনায় যাচ্ছে না ইরান?

তেহরানের অংশগ্রহণ নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের শর্ত পূরণের ওপর। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও অতিরিক্ত দাবিই প্রধান বাধা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বুধবার বলেছেন, কূটনীতি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি হাতিয়ার মাত্র এবং ইরানের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলেই কেবল এই পথে হাঁটবে তেহরান।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ইরান। ইসলামাবাদে নতুন করে আলোচনার বিষয়ে যেকোনও সিদ্ধান্ত দেশটির জাতীয় স্বার্থের ওপর নির্ভর করবে।

বাঘাই আরও বলেন, ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা ও সেগুলো জব্দ করার ঘটনা প্রমাণ করে না যে, একটি দেশ কূটনীতি নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের পাল্টা জবাব হিসেবেই ইরান আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইরানের এই মুখপাত্র জানান, ইরান খুব নিবিড়ভাবে যুদ্ধের ময়দান ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এছাড়া ইরান তাদের বৈধ অধিকার রক্ষা, আগ্রাসনের জন্য আইনি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং যুদ্ধের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা চালিয়ে যাবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী কোনও দেশের সমুদ্র ও বন্দর অবরোধ করা আগ্রাসনের শামিল বলেও উল্লেখ করেন বাঘাই। তিনি বলেন, ইরান তাদের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।

তিনি বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিষয়টি কোনও আলোচনাতেই বিকল্প হিসেবে ছিল না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, এই দুই বিষয়ই শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বড় প্রতিবন্ধক।

যুক্তরাষ্ট্রে আসল উদ্দেশ্য কী?

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই কূটনৈতিক সুযোগ ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আরও বিস্তৃত কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে।

সিএনএন বুধবার জানিয়েছে, ট্রাম্প একটি কূটনৈতিক সমাধান চাইছেন কারণ তিনি এমন একটি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে চান না, যেটিকে তিনি ইতোমধ্যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জয়’ হিসেবে দাবি করেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক অবস্থান কমায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন নৌ মোতায়েন ও নজরদারি কার্যক্রম বজায় রাখা হয়েছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানোও হয়েছে, যা চাপ বজায় রাখা ও সামরিক বিকল্প ধরে রাখার ইঙ্গিত দেয়।

এনবিসি সোমবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে একসঙ্গে তিনটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করতে পারে।

ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে যাবে। তবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তাকে জানিয়েছেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অর্থবহ কূটনৈতিক অগ্রগতির বড় বাধা হয়ে থাকবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোকে চূড়ান্ত শান্তির পদক্ষেপের চেয়ে বরং আলোচনার সময় বাড়ানো ও বিকল্প পরিকল্পনার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

কোন পথে যাচ্ছে ইরান-মার্কিন আলোচনা?

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা অর্থহীন। তিনি বলেন, পরাজিত পক্ষ শর্ত নির্ধারণ করতে পারে না। অবরোধ অব্যাহত রাখা বোমা হামলার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় এবং এর সামরিক জবাব দেওয়া প্রয়োজন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণসহ সব দিক বিবেচনা করে ইরান কূটনীতি চালিয়ে যাবে কি না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই অর্থবহ আলোচনার ভিত্তি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণের প্রতি ইরানে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের অসংগত ও নেতিবাচক ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায় তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়।

এত কিছুর পরও সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করছেন যে শিগগিরই উভয় পক্ষের মধ্যে বৈঠক হতে পারে। তবে কখন ও আদৌ সেই আলোচনা হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

তবে দিল্লির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জিওজুরিস্টুডেতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখন প্রশ্নটা কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে কি না, তা নয়; বরং উভয় পক্ষ ব্যর্থতার পরও চেষ্টা চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক কি না।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *