ম্যারাডোনার মৃত্যু মামলা : রায় ২২ ডিসেম্বর, কাঠগড়ায় সাত স্বাস্থ্যকর্মী

একসময় ফুটবল মাঠে তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে পুরো বিশ্ব। সেই দিয়েগো ম্যারাডোনার শেষ দিনগুলো ঘিরে এবার আদালতে চলছে ন্যায়বিচারের লড়াই। ২০২০ সালে আর্জেন্টাইন এই কিংবদন্তির মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে করা মামলার রায় ঘোষণা হবে আগামী ২২ ডিসেম্বর।

ছয় মাসের বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল (২২ অক্টোবর) বৃহস্পতিবার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। ম্যারাডোনার মেয়ে দালমা ম্যারাডোনা এবং কয়েকজন আসামির শেষ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মামলার শুনানি শেষ হয়।

আদালতে আবেগঘন বক্তব্যে দালমা বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার বাবা তার প্রাপ্য ন্যায়বিচার পাবেন, যেমনটা অন্য যে কারও পাওয়া উচিত।’

অন্যদিকে মামলার প্রধান আসামি, ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোলদো লুকে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘আমি নির্দোষ।’

২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফুসফুসে পানি জমাকে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মস্তিষ্কে ছোট একটি অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হওয়ার জন্য বুয়েনস এইরেসের উত্তরে তিগ্রে এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করছিলেন তিনি। সেখানকার নিজের বিছানায় তার মরদেহ পাওয়া যায়।

ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া বিচারকাজে ৭০ জনের বেশি সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তাদের সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতেই এখন রায়ের অপেক্ষায় দুই পক্ষ।

সাত আসামির মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড চেয়েছেন কৌঁসুলিরা। সবচেয়ে বেশি ১২ বছরের সাজা দাবি করা হয়েছে লুকের জন্য।

তবে প্রসিকিউশনের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন লুকের আইনজীবীরা। গত বুধবার সমাপনী যুক্তিতর্কে তারা ম্যারাডোনার মৃত্যু আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব ছিল বলে কৌঁসুলিদের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের বক্তব্য, পুরো ঘটনার দায় লুকের ওপর চাপিয়ে তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা চলছে।

বিচার চলাকালে একাধিকবার নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন লুকে। তার আইনজীবীরা আদালতে অডিও রেকর্ডিং, বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ এবং ম্যারাডোনার ময়নাতদন্তের একটি ভিডিও উপস্থাপন করেন। এসব উপস্থাপনায় ক্ষুব্ধ হন প্রয়াত ফুটবল তারকার মেয়েরা।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লুকে বলেন, ‘ম্যারাডোনার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল বলে আমাকে আক্রমণ করা সহজ।’ তার দাবি, ‘একমাত্র ডিয়েগোই আমাকে রক্ষা করতেন।’

ম্যারাডোনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে লুকে আরও বলেন, ‘আমি তার গভীরভাবে যত্ন নিতাম, তাকে ভালোবাসতাম। তিনি ছিলেন আমার আদর্শ ও বন্ধু।’

মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার সময় ম্যারাডোনাকে হাসপাতালে না রেখে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথাযথ ছিল কি না। এই সিদ্ধান্তের ফলে তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছিল কি না, তা নিয়েই মূলত আইনি লড়াই চলছে।

কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ম্যারাডোনার চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত বাড়িতে হাসপাতালের শয্যা, ডিফিব্রিলেটর কিংবা দ্রুত পৌঁছানোর উপযোগী অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল না। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুতর অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।

এ ছাড়া আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া কয়েকজন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ বলেছেন, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনার শরীরে দেখা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গগুলো শনাক্ত করার পরও দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী,‘ম্যারাডোনার শরীরে পানি জমেছিল, হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে গিয়েছিল এবং শ্বাসকষ্টও দেখা দিয়েছিল।’

এখন ২২ ডিসেম্বরের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন ম্যারাডোনার পরিবার, অভিযুক্ত চিকিৎসাকর্মী এবং ফুটবলবিশ্বের অসংখ্য সমর্থক। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে করা এই মামলায় আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, কিংবদন্তির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *