চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের কর্তৃপক্ষ দৃঢ়কণ্ঠে জানিয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাই তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারবে।
দুটি দেশের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে ইরানকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করতে চায়। তবে ইরানের সরকার জানিয়েছে তারা প্রস্তুত রয়েছে; এ বিষয়ে দেশটির অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী আলী মাদানিজাদে সোমবার রাতে রাষ্ট্রীয় টিভিতে দুই বছরের একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে ইরানের বহু বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাদানিজাদে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব হাতিয়ার রয়েছে এবং আমরা এই খেলাটাও জানি।’ তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর একমাত্র প্রভাবশালী শক্তি নয়- এমন একটি বিশ্বে তেহরান সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে পারে এবং তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, অনেক দেশই ইরানের সাথে সব সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সোনা মজুদ করা ইরানের প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সম্পদ-সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশটির সরকার জ্বালানি রেশনিং বা পরিমিত ব্যবহারে বাধ্য হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেমমাতি চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ইরানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে হেমমাতি ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার কোনো ঘাটতি নেই, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ অর্থের মজুদ ‘এমন কিছু জায়গায় রয়েছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নেই’।
হেমমাতি অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং জনগণের ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করলেও বলেন, ‘কষ্ট সহ্য করা আর ভেঙে পড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, অথচ যুক্তরাষ্ট্র সেটাই চাচ্ছে।’
মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মহাজেরানি জানান, ইরানিরা যেন আগামী এক বছরে পরিস্থিতির কোনো উন্নতির আশা না করেন। তিনি আরও বলেন, দেশের দারিদ্র্যের স্তরের তথ্য প্রকাশের জন্য সরকারকে ইরান সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিতে হবে।
খোলা বাজারে গত মঙ্গলবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের জাতীয় মুদ্রার মান কমে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ২.০৫ মিলিয়ন (২০ লাখ ৫০ হাজার) রিয়ালে নেমে আসে, যা বুধবারে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়।
ঘরেই উৎপাদন করুন
এই অস্থিরতা সত্ত্বেও, ইরানের নবনিযুক্ত নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাই চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাষ্ট্রীয় টিভির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তরুণ ইরানিদের ‘অর্থনীতিতে প্রবেশ’ করার এবং নিজেদের পরিবার ও সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ঘরেই উৎপাদন বা তৈরি শুরু করার আহ্বান জানান।
এই মানসিকতা কয়েক দশক ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির কৌশলগত চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে, যেখানে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোতে বারবার ‘স্বাবলম্বিতা’র ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং বিশাল মূল্যের বিনিময়ে হলেও তা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারের দাবি—ইরান তার কৃষি পণ্যের ৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন করতে পারে। যদিও অভ্যন্তরীণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ইরানের তীব্র পানি সংকট সমস্যার জন্য কী বার্তা বয়ে আনে তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যাচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রী গোলাম-রেজা নুরী মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় টিভিতে জানান, চূড়ান্ত লক্ষ্য অনুযায়ী দেশের সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদনের আগে, স্বল্পমেয়াদে অভ্যন্তরীণ খাদ্য স্বাবলম্বিতা ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তেহরানের।
রেজা নুরী বলেন, ইরান প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য আমদানি করে এবং ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে — যদিও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই মার্চ মাসে কিছু পণ্যের রপ্তানি স্থগিত করা হয়েছিল।
গম, ভুট্টা, চাল এবং ভোজ্য তেলসহ মৌলিক খাদ্য ও পশুখাদ্যের জন্য ইরান আমদানির ওপর নির্ভর করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব রপ্তানি হাবের মাধ্যমে ইরানে পরিশোধিত চিনি এবং গমের আটার অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী। রাশিয়া ও মধ্য এশিয়াও কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে উত্তর ইরানে কিছু শস্য পাঠাতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মার্চ মাসে জানায়, আমদানির ক্রমবর্ধমান খরচ, লজিস্টিক ব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষায় গৃহীত নীতি সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো ইরানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত করছে এবং পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। সংস্থাটি এই সতর্কতাও দেয় যে, স্থল বাণিজ্য পথগুলোর সেই সক্ষমতা নেই যা দিয়ে সমুদ্রপথে পরিবহণ করা বিপুল পরিমাণ পণ্যের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
স্ট্যাটিস্টিকাল সেন্টার অব ইরানের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাই মাসে ইরানে খাদ্যের দাম এক বছর আগের তুলনায় ১২৮ শতাংশেরও বেশি ছিল। তেহরানসহ সমগ্র দেশে এখন একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে ছয় মাস আগের তুলনায় অনেক কম খাবার কেনা যায়।
ইরান সরকার আরও দাবি করে যে, দেশটি তার ওষুধের প্রায় ৯৭ শতাংশ নিজ দেশেই উৎপাদন করে, যদিও মোট ওষুধ ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত ওষুধের অংশ অনেকটাই বড়।
সংসদের স্বাস্থ্য কমিটির মুখপাত্র সালমান এশাকি মে মাসে জানিয়েছিলেন, ইরান প্রায় এক হাজার প্রকার ওষুধের ক্ষেত্রে কিছু মাত্রায় ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছিল। বেশ কয়েকটি আমদানিতে সস্তা মুদ্রা বরাদ্দ ধীরে ধীরে বন্ধ করার বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করার পর, চলতি সপ্তাহসহ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওষুধের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধের সময়ের কঠিন সিদ্ধান্ত
ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা যুদ্ধের সময় দেশের অবকাঠামোতে সৃষ্টি হওয়া ক্ষতি দ্রুত মেরামত করার কাজ করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ব্যাপকভাবে বোমা হামলার শিকার হওয়া তেল, গ্যাস ও ইউটিলিটি সুবিধাগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই যুদ্ধ ইরানের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট এবং অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট তেহরানসহ সারা দেশের পরিবার এবং শিল্প কারখানাগুলোকে ভোগান্তিতে ফেলছে, অন্যদিকে কয়েক মাসের মধ্যে আবহাওয়া ঠান্ডা হয়ে এলে ও চাহিদা বাড়লে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান, মাশহাদ, কারাজ এবং অন্যান্য কয়েকটি শহরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পেট্রোল পাম্পে সরকারের বরাদ্দ করা জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, যার ফলে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
সরকারের মুখপাত্র মহাজেরানি বুধবারে প্রতিশ্রুতি দেন যে ২২ সেপ্টেম্বর চলতি ইরানি ক্যালেন্ডার মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান জ্বালানির দাম ও কোটার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকবে। তবে সরকার ইতোমধ্যেই ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য জ্বালানি কোটা কমিয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল রিফাইনিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বুধবার আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছে যে, আগামী মার্চের শেষের দিকে চলতি বছরের মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে দুটি নতুন শোধনাগার চালুর ফলে ইরানের উৎপাদন সক্ষমতা দিনে প্রায় ১২ মিলিয়ন লিটার বৃদ্ধি পাবে, যা কিছুটা ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে।
তবে সামাজিক অসন্তোষের সময় আবারও রক্তপাত এড়াতে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার বেদনাদায়ক সংস্কারে নামতে বাধ্য হচ্ছে বলে মঙ্গলবার এক বক্তৃতায় সতর্ক করেছেন ইরানি অর্থনীতিবিদ সাদেক আলহোসিনী।
আলহোসিনী বলেন, ‘ইরান যদি বড় আকারের বিশৃঙ্খলার দিকে যায় — কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পেট্রোলের দীর্ঘ লাইন এবং ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পরিণত হয় — তবে আরও খারাপ কিছু ঘটবে যা সামলানো অনেক বেশি কঠিন হবে।’
তবে জ্বালানির দামের নতুন বৃদ্ধি পরিবহন খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে, যেখানে মানুষ ইতোমধ্যেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইরান হয়তো এই ঐতিহাসিক স্তরের চাপ সহ্য করে যেতে পারে, তবে দিন দিন দেশটি এমন এক চক্রের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ছে যেখানে তার সম্পদ এবং সক্ষমতা ক্রমাগত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।