বিহারে ছাত্র বিক্ষোভের সময় একে-৪৭ থেকে গুলি, বরখাস্ত পুলিশ কনস্টেবল

ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে দেশজুড়ে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিহার রাজ্যে ‘বনধ্’ পালনের সময় এক পুলিশ সদস্যকে প্রাণঘাতি অস্ত্র একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে দেখা গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গত ২৫ জুলাই অভিষেক প্যাটেল নামের ওই পুলিশ কনস্টেবল হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরে গুলি করতে করতে বিক্ষোভকারীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন। খবর ইন্ডিয়া টুডের।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে বিহার রাজ্যসভার সদস্য মনোজ কুমার ঝা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থে একটি মামলা দায়ের করেন। সবশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ওই পুলিশ কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রকাশিত ভিডিওটিতে আরও দেখা যায়, নীল হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরা ওই পুলিশ সদস্য অভিষেক প্যাটেল বিক্ষোভকারীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন। সহকর্মীদের তাকে অনুসরণ করতে বলার আগেই ভিডিওতে অন্তত একটি গুলি ছোড়ার শব্দ ও দৃশ্য পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। এরপর তার এক সহকর্মী এগিয়ে এসে নিচু হন এবং মাটি থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে ছুড়ে মারেন।

রাজ্যব্যাপী ওই ধর্মঘটে একাধিক জেলায় ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা গেছে। নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়াসহ একাধিক স্থানে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভস্থলে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস এবং জলকামান ব্যবহার করে।

জানা গেছে, বিহার রাজ্যের সিওয়ানে গুলিতে আহত তিন বিক্ষোভকারী পাটনার ‘জয়প্রভা বেদান্ত হাসপাতালে’ চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে রয়েছে ১৫ বছর বয়সী মো. আরিফ, যিনি একটি দোকানে কাজ করেন। পরিবার জানায়, আন্দোলনের সময় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে তার ঘাড়ে গুলি লাগে।পরে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি বের করে আনেন এবং তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল রয়েছে বলে স্বজনরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। রাজ্যব্যাপী ধর্মঘটের অংশ হিসেবে পাটনায় বহু শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে গান্ধী ময়দানের দিকে পদযাত্রা করেন। তারা যখন নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন, তখন পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিওয়ানের পুলিশ সুপার পূরণ কুমার ঝা নিশ্চিত করেছেন যে, শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ওই কনস্টেবলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি পিটিআই-কে বলেন, জেলা গোয়েন্দা ইউনিটে কর্মরত ওই কনস্টেবলকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্র বিক্ষোভের সময় একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহারের দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।

তবে তিনটি শিশু আহত হওয়ার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের দাবিকে অস্বীকার করে পুলিশ সুপার পূরণ ঝা বলেন, এই গুলিবর্ষণে কেউ আহত হয়নি।

পূরণ কুমার ঝা আরও জানান, কোন পরিস্থিতিতে ওই কনস্টেবল একে-৪৭ রাইফেল থেকে গুলি ছুড়েছিলেন তা বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিক্ষোভের সময় গুলি না চালানোর ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর কাছে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল।

বিহারের বিরোধীদলীয় নেতা তেজস্বী যাদব দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এবং সেই সাথে যে ভিডিওটিতে পুলিশ সদস্যকে শিক্ষার্থীদের দিকে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে, সেটি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন।

এদিকে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও এই বিষয়টি সামনে তুলে ধরে বলেন, দেশের সর্বত্রই একই ধরন অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি দিল্লিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পেলেট বন্দুকের ব্যবহার এবং বিহারে একে-৪৭ ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই বাহিনীর প্রাথমিক দায়িত্ব এবং নির্ধারিত নিয়ম বা নির্দেশিকার যেকোনো লঙ্ঘনকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়। তারা জানান, একটি বিস্তারিত বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং এর ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই তদন্তের মাধ্যমে অস্ত্র ব্যবহার পুলিশের নিয়মমাফিক ছিল কি না এবং এর জন্য কোনো ধরণের বিভাগীয় বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার কি না তা নির্ধারণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *