বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরার বিজিএমইএ কার্যালয়ে আয়োজিত এই বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও শিল্প খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এ সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ সোহেল, মহাসচিব মেজর জেনারেল ড. মো. সাহেদুল ইসলাম (অব.) ও ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা।
আলোচনায় উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন। দুই ভাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা এখনও পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষার তাগিদ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য পাকিস্তান থেকে আমদানি করলেও, সে তুলনায় বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে রপ্তানির পরিমাণ বেশ কম।
এই বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে বিজিএমইএ সভাপতি পাকিস্তান থেকে পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যালস ও ডাইস আমদানি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি, তিনি বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমানের জুট ইয়ার্ন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জীবন রক্ষাকারী ফার্মাসিউটিক্যালস আরও বড় পরিসরে আমদানি করার জন্য পাকিস্তানের হাইকমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। হাইকমিশনার বিজিএমইএ সভাপতির এই প্রস্তাবগুলোতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল কর্তৃক সফর বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাকিস্তানের হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য খাতের রপ্তানিকারকদের সমন্বয়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করলে সেখানে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক, ব্র্যান্ড, বায়ার এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সুনির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক বৈঠক (বিটুবি মিটিং) ও ম্যাচ-মেকিং সেশনের আয়োজন করে দেওয়া হবে।
বৈঠকে উভয় দেশের বাজারের সুযোগ ও বাজার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর কৌশলগত উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি দেশ হিসেবে সাফটা এর আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আসবে। এই উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দুই দেশের বাণিজ্য প্রবাহ অব্যাহত ও সুরক্ষিত রাখতে উভয় দেশ কিভাবে একটি কার্যকর দ্বিপাক্ষিক বিশেষ মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, সে বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বর্তমানে সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে, যা কমানো জরুরি। দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই লজিস্টিকস ও শিপিং সংক্রান্ত বাধাগুলো দূর করা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
এছাড়া বৈঠকে টেক্সটাইল, অ্যাপারেল ও ফ্যাশন খাতের দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা হয়।
পাকিস্তানের হাইকমিশনার বলেন, বিইউএফটি এবং পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ও টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থী বিনিময়, অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান আদান-প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে টেক্সটাইল প্রযুক্তির পারস্পরিক উন্নয়ন ও উৎকর্ষ সাধনে দুই দেশের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও হাইকমিশনার বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সুসম্পর্ক এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিকে আগামী দিনগুলোতে আরও অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করে তুলবে।