প্রথমবার আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ, ১০০ কোটি ডলারের বন্ড আসছে

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই বন্ড বিক্রি করে ৫০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে সরকার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০০ কোটি ডলারের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। 

বন্ডটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিতে বিশ্বের অন্যতম বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেপিমরগ্যান চেজ অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এরই মধ্যে ইউরোপ ও নিউইয়র্কে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। এসব বৈঠকে বন্ডটির বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের আভাস পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 

সরকারের এই উদ্যোগ সফল হলে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব ঋণের মূল্য বা সুদের হার নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রায় সরাসরি বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের নতুন পথও খুলতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঋণমান, বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য সুদের হার নিয়ে সতর্ক রয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সুদে বন্ড ছাড়লে তা ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে।

তিন মাসের মধ্যে ছাড়ার প্রস্তুতি

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৫০ কোটি ডলারের বন্ড ছাড়ার কথা ভাবা হলেও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তা ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বন্ডটি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ছাড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

বন্ড ইস্যুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গত জুলাইয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি ওই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কমিটি এরই মধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে।

সম্প্রতি ইউরোপ ও নিউইয়র্কে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের বন্ড নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্ডের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সুদের হার এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বিশেষভাবে বিবেচনা করা হবে।

আগ্রহ ১৫ বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্ল্যাকরক, প্যাসিফিক ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি— পিমকো, টেক্সাস প্যাসিফিক গ্রুপ— টিপিজি, ম্যাকোয়ার, গোল্ডেন ট্রি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও মেটলাইফসহ প্রায় ১৫টি বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সম্ভাব্য সার্বভৌম বন্ডের বিষয়ে প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েছে।

সরকারের বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেছেন, সার্বভৌম বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের মাত্রা ‘অত্যন্ত বেশি’। তবে বন্ডের কাঠামো, সুদের হার ও অন্যান্য আইনি বিষয় চূড়ান্ত করার আগে আরও আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের খরচ বাড়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কী পরিমাণ সুদ দিতে হবে, সেটি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে বাংলাদেশ

এত দিন বাংলাদেশ বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও আইএমএফসহ উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করেছে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ঋণও রয়েছে।

কিন্তু বৈশ্বিক সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের শর্ত ও ব্যয় আগের তুলনায় বদলেছে। একই সময়ে দেশের উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং ডলারের চাহিদা বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর একটি বড় অংশ ঘাটতি অর্থায়নের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। ফলে সরকারের অর্থায়নের উৎস বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে সেই উৎস কিছুটা বৈচিত্র্যময় করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ডলার বন্ডই প্রথম পছন্দ

প্রথম বন্ডটি মার্কিন ডলারে ছাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারভিত্তিক বন্ডের বাজার বড় হওয়ায় এই মুদ্রাকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

তবে ভবিষ্যতে জাপানি ইয়েনে সামুরাই বন্ড, চীনা ইউয়ানে পান্ডা বন্ড, হংকংয়ের ডিম সাম বন্ড এবং ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ড ছাড়ার সম্ভাবনাও যাচাই করছে সরকার।

চীনের পাণ্ডা বন্ড নিয়ে চীনা এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচনা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। 

সুদের হারই বড় চ্যালেঞ্জ

সার্বভৌম বন্ডের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হতে পারে সুদের হার। কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোনও দেশের ঋণমান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করে বন্ডের সুদের হার নির্ধারণ করে। 

বাংলাদেশের ঋণমান এখনও তুলনামূলক নিচের স্তরে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সূচকে পরিবর্তন এসেছে। মুডিজ বাংলাদেশের ঋণমানের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস ও ফিচের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখনও ঝুঁকির বিষয়টি রয়েছে।

ফলে প্রথম বন্ডে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি-প্রিমিয়াম চাওয়া হতে পারে। এতে অর্থ সংগ্রহের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

রিজার্ভে কতটা স্বস্তি দেবে

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ায় রিজার্ভে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি, জ্বালানি ও পণ্য আমদানির ব্যয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের চাপ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার নতুন করে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে পাওয়া গেলে তা রিজার্ভে তাৎক্ষণিক কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে এই অর্থ ঋণ হওয়ায় ভবিষ্যতে মূল অর্থের পাশাপাশি সুদও পরিশোধ করতে হবে।

অর্থ কোথায় খরচ হবে

সার্বভৌম বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আয় তৈরি করে ঋণ পরিশোধে সহায়তা করতে পারে। 

অবকাঠামো, বন্দর ও রেল যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর মতো খাতে বিনিয়োগ করলে অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ বেশি।

অপরদিকে চলতি বা অনুৎপাদনশীল ব্যয় মেটাতে বৈদেশিক বন্ডের অর্থ ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সিপিডির গবেষক ও অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বন্ডের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা জরুরি। তার মতে, সরকারের পরিচালন ব্যয় বাড়তে থাকলে নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে সেই ব্যয় মেটানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। 

আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পরিচয়

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রথম সার্বভৌম বন্ড বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থ সংগ্রহের একটি মাধ্যম নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে দেশের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতার একটি নতুন পরীক্ষা। 

প্রথম ইস্যুতে কত ডলার পাওয়া গেল, তার পাশাপাশি কোন সুদে এবং কী শর্তে বাংলাদেশ অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে— সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। সফলভাবে প্রথম বন্ড ছাড়তে পারলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় পরিসরে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নতুন বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার আগে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ডলারের বিনিময় হার এবং বন্ডের সুদের হার— এই তিনটি বিষয়ই সরকারের জন্য বড় বিবেচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *