দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের একটি বস্তিতে সশস্ত্র বন্দুকধারীদের হামলায় ১২ জন নিহত হয়েছে। দেশটিতে এটিই সর্বশেষ গণ-গুলিবর্ষণের ঘটনা বলে বুধবার (১০ জুন) জানিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার মধ্যরাতের আগে ধাতব পাত ও কাঠের তৈরি ঝুপড়ি ঘরের এক দরিদ্র বস্তিতে এই গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, যার কাছাকাছি এলাকায় অবৈধ খনি শ্রমিকরা বসবাস ও কাজ করত।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, প্রায় ১০ জন হামলাকারী একটি গাড়িতে করে ‘জাম্পার্স’ নামক ওই বস্তিতে আসে এবং গাড়ি থেকে নেমে এলাকায় তাণ্ডব চালায়।
মুখপাত্র বলেন, ‘সন্দেহভাজনরা দুটি প্রবেশপথ দিয়ে বস্তিতে ঢোকে এবং বিভিন্ন স্থানে বাসিন্দা ও স্থানীয় লোকজনের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে একই গাড়িতে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।’
মুখপাত্র আরও বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে এই হামলায় ১২ জন মারা গেছেন। ঘটনাস্থলেই আটজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এছাড়া আরও একজন হাসপাতালে মারা যান।’
অবৈধ খনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা
দক্ষিণ আফ্রিকায় বৈধ ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি রয়েছে এবং সেখানে গুলিবর্ষণের ঘটনা খুবই সাধারণ। প্রায়শই ‘গ্যাংদের’ মধ্যকার শত্রুতা এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতার কারণে এসব ঘটনা ঘটে থাকে।
এই হামলাটি জোহানেসবার্গ শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পূর্বে এবং কিছু পরিত্যক্ত সোনার খনির কাছাকাছি একটি এলাকায় ঘটেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য এখনও জানা যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি ওই এলাকার অবৈধ খনি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত কোনো বিষয় হতে পারে।
প্রাদেশিক কমিশনার লেফটেন্যান্ট জেনারেল টমি মথোমবেনি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন যে, এই এলাকাটি একটি অবৈধ খনির এলাকার পাশে অবস্থিত। আমাদের সেই সন্দেহই হচ্ছে। এই ঘটনাটিকে এক কথায় উন্মাদনা, নির্মম এবং এক অর্থে বর্বর বলা যায়।’
মথোমবেনি জানান, তিন সপ্তাহ আগে পুলিশ এই এলাকায় একটি অভিযান চালিয়েছিল এবং সেখানে একে-৪৭ রাইফেল ও গোলাবারুদ জব্দ করার পাশাপাশি তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল।
নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে একজন বাসিন্দা ‘ইএনসিএ’ সম্প্রচার মাধ্যমকে জানিয়েছেন, পাশের দেশ লেসোথো থেকে আসা মানুষজন ওই বস্তিতে বসবাস করতো।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী একজন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জানান, হামলাকারীরা প্রথমে একটি অবৈধ খনি খাদের ওপর তৈরি করা ঝুপড়ি ঘরে গুলি চালায় এবং এরপর পাশের মদের দোকানগুলোর দিকে এগিয়ে যায়।
নিউলেন পিটারসেন নামের ওই কাউন্সিলরের বরাত দিয়ে বলা হয়, ঘটনাস্থল দেখে মনে হচ্ছে বেশ সুপরিকল্পিত এবং নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তুকে সামনে রেখে এই অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার পর, কর্তৃপক্ষকে সেখান থেকে অবৈধ খনি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার অবৈধ খনি ব্যবসা এই অঞ্চলের মানুষকে আকর্ষণ করে এবং এটি সুসংগঠিত অপরাধ, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত। জোহানেসবার্গ এবং এর আশেপাশের সোনার খনি এলাকাগুলোর বস্তিগুলোতে এই গোপন ও অনানুষ্ঠানিক খনি শ্রমিকদের উপস্থিতি এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
এর আগে, অবৈধ খনি গ্যাংদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের জেরে গত ডিসেম্বরে জোহানেসবার্গের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত দরিদ্র বেকার্সডাল শহরের একটি বারে বন্দুকধারীদের গুলিতে নয়জন নিহত হয়েছিল।
চলতি বছরের মার্চ মাসে, ব্যাপক অপরাধ দমনে পুলিশের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে জোহানেসবার্গের সহিংসতা-প্রবণ এলাকাগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এই অপরাধ প্রবণতাকে দেশের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।