তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত প্যারিস : হাসপাতালে চাপ কমাতে মদ পানে নিষেধাজ্ঞা

ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে ফ্রান্স। এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে রাজধানী প্যারিসের হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় কমাতে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের উন্মুক্ত গণপরিসর বা পাবলিক প্লেসে মদ্যপান ও টেক-অ্যাওয়ে (দোকান থেকে কিনে নিয়ে যাওয়া) মদ বিক্রির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

নতুন এই নিয়মানুযায়ী, প্যারিসের বাসিন্দারা আজ শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর ১২টা থেকে আগামীকাল শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টা পর্যন্ত কোনো পাবলিক প্লেসে মদ পান করতে পারবেন না। একই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে শনিবার দুপুর থেকে রোববার সকাল ৭টা পর্যন্ত। এছাড়া শুক্রবার ও শনিবার প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত সব ধরনের টেক-অ্যাওয়ে মদ বিক্রি বন্ধ থাকবে। তবে লাইসেন্সধারী বার এবং রেস্তোরাঁগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।

প্যারিসের পুলিশ প্রধান পাত্রিস ফোর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আমাদের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা এখন প্রায় ধারণক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকরনু স্বাস্থ্য সতর্কতার মাত্রা সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেছেন। যাতে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা যায় এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের রক্ষা করা সম্ভব হয়। 

দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, এই তীব্র গরমে কেবল বয়স্করাই নন, যুবকরাও হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্যারিসের অ্যাম্বুলেন্স সেবা সংস্থা জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সাধারণ সময়ের তুলনায় চার গুণ বেশি মানুষ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়েছেন।

প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার ফরাসি টেলিভিশনকে বলেন, রাজধানীতে মৃত্যুর হার ক্রমশ বাড়ছে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের ভাবা উচিত নয় যে আমরা অপরাজেয়। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকেও আমি রাস্তায় অন্তত ১০০ জন মানুষকে জগিং করতে দেখেছি। সত্যি বলতে, এই পরিস্থিতিতে এটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। শরীরচর্চা থেকে দুই-একটা দিন বিরতি নিলে কোনো ক্ষতি হবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, টানা এক সপ্তাহ ধরে চলা এই তীব্র গরমে সাইকেল চালানোও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ যেকোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। এরই মধ্যে প্যারিস অঞ্চলে একটি গাড়ির ভেতর থেকে তিন বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্পেনত্রাস শহরেও একটি গাড়ির ভেতর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়া রেনেস শহরের একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লুই সুলাস জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে নিজ বাড়িতেই প্রায় ৫ থেকে ৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বয়স ৬০ বা তার বেশি।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল। আজও অনেক অঞ্চলে পারদ আরও উঁচুতে উঠছে। ফরাসি আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বুধবার রাতে দেশের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রাই ছিল ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নঁত শহরে তা ২৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইউরোপের এই তাপপ্রবাহের পেছনে স্পষ্টভাবেই জলবায়ু সংকটের ছাপ রয়েছে। তিনি দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বন রক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। এদিকে এই তাপদাহ এখন ইউরোপের পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রের আবহাওয়াবিদেরা চরম আবহাওয়ার সতর্কতা জারি করেছেন। আজ জার্মানিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করতে পারে। এছাড়া ইতালিতেও আগামী সোমবার নাগাদ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *