ডেঙ্গু মোকাবিলায় ডিএসসিসির বরাদ্দ বাড়ল সাড়ে তিনগুণ

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে সংস্থাটির বরাদ্দ প্রায় সাড়ে তিনগুণ বাড়িয়ে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা করা হয়েছে।

এই বরাদ্দের মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম।

আবদুস সালাম এ প্রসঙ্গে বলেন, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ডিএসসিসির বরাদ্দ ছিল ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এর তুলনায় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, নতুন বরাদ্দের বড় একটি অংশ ব্যয় হবে মশক নিয়ন্ত্রণ ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে। কর্পোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইডিং এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইডিং করা হচ্ছে। মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মান ও নিয়মিততা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ওয়ার্ডে ডিএসসিসির বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদারকি টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে। একই সঙ্গে মশককর্মী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসক বলেন, মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষায় শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি মশক নিয়ন্ত্রণে বিকল্প পদ্ধতি ও ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে এবং তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এবার মশক নিধনের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে চলতি বছর প্রাক-বর্ষা এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ঘনত্বে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।

জরিপের ভিত্তিতে ২৭টি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রাক-বর্ষা জরিপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই শনাক্ত হওয়ায় সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, শুধু মশক নিধনের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ কারণে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

জনসচেতনতা বাড়াতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ক্যাম্পেইন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক কনটেন্ট ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনচিত্র (টিভিসি) প্রচার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচারণা এবং জাতীয় দৈনিকে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, সতর্ক করার পরও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানার পাশাপাশি বাসা বা প্রতিষ্ঠানকে লাল চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা ও মাতৃত্ব খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে তা কমে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছিল।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির ফলে মশক নিয়ন্ত্রণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারিত ও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, চলতি অর্থবছরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন, প্রাক-বর্ষা লার্ভা জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে ক্রাশ প্রোগ্রাম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মোবাইল কোর্ট এবং ব্যাপক জনসচেতনতা-এই ছয়টি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোই এখন ডিএসসিসির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *