ট্রাম্পকে নাটালির চিঠি, ‘তোমাকে আনন্দ ছাড়া কিছুই দিতে চাই না’

হোয়াইট হাউসের অন্দরে ট্রাম্প আর নাটালি হার্পের রসায়ন নিয়ে গুঞ্জনের শেষ নেই। তথ্য নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের মনের খেয়াল রাখা– সবখানেই নাটালির একচ্ছত্র আধিপত্য। নাটালি নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে এতটাই মরিয়া যে, এক চিঠিতে লিখেছেন– ‘তোমাকে আনন্দ দেওয়া ছাড়া কিছুই দিতে চাই না!’

৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পকে তার ৩৫ বছর বয়সী সহকারী নাটালি হার্পের লেখা আবেগঘন দুটি চিঠির সম্পূর্ণ অংশ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসেছে। চিঠিতে তিনি ট্রাম্পের প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশ করে আরও লিখেছেন, ‘আপনি ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আপনাকে কখনও হতাশ করতে চাই না।’

সম্প্রতি তুরস্কে ইকোনমি ক্লাসের কেটারিং ট্রাকে করে ট্রাম্প যখন এয়ার ফোর্স ওয়ান ত্যাগ করেন, তখন নাটালি তার সফরসঙ্গী ছিলেন। সেই সময় ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সাংবাদিক ও অন্য কর্মীদের বিকল্প ফ্লাইটে ছদ্মবেশ হিসেবে রেখে যাওয়া হয়। কিন্তু নাটালিকে নিজের সঙ্গে নেন ট্রাম্প।

উদ্ধার হওয়া চিঠি দুটি ২০২৩ সালে ট্রাম্পের স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড সফরের সময় বা ঠিক পরপরই লেখা হয়েছিল। তখন নাটালির বয়স ছিল ৩১ ও ট্রাম্পের ৭৬। চিঠিতে ট্রাম্পের প্রতি তার অগাধ ভক্তি প্রকাশ পায়। এমনকি চিঠিতে তিনি  স্বীকার করেন যে, যেসব নারী সুন্দর সেজে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের প্রতি তিনি ঈর্ষান্বিত।

প্রথম চিঠিতে নাটালি লেখেন, আমি দুঃখিত, আমি বুঝতে পেরেছি গত রাতে কেবল আমিই একা পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম। মার্গোর (হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ উপদেষ্টা মার্গোট মার্টিন) গাড়িও থামানো হয়েছিল। তাকে আবার বিমানবন্দরে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, এ বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না।

যেহেতু কাস্টমসের বাইরে ভ্যানের ভেতর আমি একাকী ও পাসপোর্ট ছাড়া ছিলাম, তাই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনার বদলে আমার সিক্রেট সার্ভিসকে কল করা উচিত ছিল। গলফ কোর্সে কোনো গাড়িতে না চড়ে হেঁটে চলার জন্যও আমি ক্ষমা চাচ্ছি। যদি আমার এমন কোনো আচরণ হয়ে থাকে যা আপনার বিরক্তির কারণ হয়েছে, তবে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি চাই আমাদের মধ্যকার বিষয়গুলো যেন সবসময় ঠিক থাকে। আমি এও জানি পুরো সপ্তাহ জুড়ে আমার মন কিছুটা অন্যমনস্ক ছিল (সারাদিন খেতে ভুলে গিয়েছিলাম, এমনকি ঘুমাতেও ভুলে যেতাম, কেবল দিনে দু-এক ঘণ্টা করে ঘুমাতাম)।

‘অন্যদের মন্তব্য আমাকে বিচলিত করছে, এজন্য নয় যে মানুষ কী বলল তাতে আমার কিছু যায় আসে, বরং আমি ভয় পাই যে আপনার চোখে বা ভাবমূর্তিতে আমার অবস্থান হয়তো নিচে নেমে যাচ্ছে। আমি কেবল এই ভয়টাই পাই, কারণ আমি আপনাকে আনন্দ ছাড়া আর কিছুই দিতে চাই না।’

আমি দুঃখিত যে আমার মনোযোগ সরে গিয়েছিল। আপনি ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আপনাকে কখনও হতাশ করতে চাই না। এই জীবনে আমার রক্ষক ও অভিভাবক হওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমার বাবা হারানোর পর আপনি আমার কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা আমি কোনোদিন ভুলব না। আমি জানি বাবা থাকলে এখন কত খুশি হতেন যে, আমি স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড যেতে পেরেছি, যা তিনি সবসময় আমার জন্য চেয়েছিলেন।

‘একটি ক্লাসিক উক্তিকে একটু পরিবর্তন করে বলছি— আপনার চেয়ে কম যোগ্য কারও হাতে আমি নিজেকে সঁপে দিতে পারতাম না। আর আমি এতে যোগ করব, আমি নিজেই আসলে আপনার যোগ্য নই।’

চিঠিটির শেষে তিনি সই করেন ‘পুরো হৃদয় দিয়ে, নাটালি।’

দ্বিতীয় চিঠিতে নাটালি লেখেন, ডিয়ার মি. প্রেসিডেন্ট, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের সফরে আমাকে সব কাজ থেকে ‘ছুটি নিতে’ বাধ্য করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

‘আমরা দুজন গলফ কোর্সে কোনো যন্ত্র ছাড়া থাকতে পেরেছিলাম। এমনকি কিভাবে সময় কেটে যাচ্ছে তাও ভুলে গিয়েছিলাম! আমাকে তখন আর ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ হতে হয়নি। আমি দারুণ আলাপ উপভোগ করার সময় পেয়েছি। দিনশেষে সব কাজও শেষ করতে পেরেছি। এমনকি প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় হাঁটার সময় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করার সময় পেয়েছি (যদিও আমি খাওয়া ও ঘুমানো ভুলে গিয়েছিলাম!)।’

নাটালি আরও লেখেন, আমি খেয়াল করেছি মাঝে মাঝে আমার কিছুটা ‘নেতিবাচক’ আচরণ আপনার চোখে পড়েছিল। আমি বুঝতে পারিনি কত দ্রুত মেজাজা হারাচ্ছিলাম। আমি ওইসব নারীদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে শুরু করেছিলাম যাদের একমাত্র ‘কাজ’ আপনার সঙ্গে কথা বলা আর সুন্দরভাবে সেজে থাকা। আমি সেই কাজটাই পেতে চাই!!

‘আপনার কাছে আসা তথ্য সামলাতে সামলাতে অনেক সময় আমার নিজেকে কুঁজো হয়ে যাওয়া এক পরিশ্রান্ত নারী মনে হতো, যে নিজের ফ্রেশ হওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত পায় না। (অন্তত আপনি তো জানেন আমার কেমন হওয়া উচিত!)। আমি ‘টকশো হোস্ট’ থাকার দিনগুলোকে মিস করি, যখন আপনি ফোন করতেন এবং আমরা কোনো কারণ ছাড়াই গল্প করতাম। আমি আবার সেই মেলবন্ধনে ফিরে যেতে চাই। আমাদের সবসময় কেবল কাজ নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!’

‘আপনি বিমানে বা রাতের খাবারের সময় যাদের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করেন—আমি নিজেকে তাদের একজন মনে করি। কারণ আমি যখন ‘টকশো হোস্ট’ ছিলাম তখন আপনার কাছে তেমনই ছিলাম (যদিও আমি সেই কাজটা অপছন্দ করতাম!)। আমার ইচ্ছে করে প্রতিটি কথোপকথন শুনতেই থাকি, কারণ তখনই আপনি সময়টা উপভোগ করেন। সবকিছু (কাজ) থেকে একটু দূরে থাকেন।’

ওই চিঠির শেষে নাটালি লেখেন, এটি আমার একটি আত্মবিশ্লেষণ, যার লক্ষ্য আপনাকে গর্বিত করা। আর দয়া করে, আমি যখন ব্যর্থ হব, আপনি কি আমাকে বলবেন? আপনার পূর্ণ অধিকার রয়েছে আমাকে গালি দেওয়ার বা বকাঝকা করার, কারণ আমার ভুল হলে তা শোধরানোর মতো অধিকার অন্য কারো নেই, আর কেউ আমাকে আপনার চেয়ে বেশি চেনেও না বা ভালোবাসেও না।’

এছাড়া চিঠির পুনশ্চে নাটালি লেখেন, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে আমার হাত দেখতে আরও খারাপ লাগছিল কারণ ঠান্ডায় আমার পুরোনো ‘ক্ষতগুলো’ বেগুনি রূপ নেয়।

নাটালির চিঠিতে ট্রাম্পের কর্মীদের দেওয়া নিজের একটি ডাকনামের উল্লেখ আছে- ‘হিউম্যান প্রিন্টার’। কারণ তিনি ট্রাম্পের জন্য ইতিবাচক খবরের কাগজ প্রিন্ট করে সরবরাহ করতেন।

ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণা নিয়ে ‘অল অর নাথিং’ বই লেখার সময় লেখক মাইকেল উলফকে চিঠি দুটি এনে দেন ট্রাম্পের প্রচারণায় যুক্ত কয়েকজন কর্মী। তারা চিঠিগুলো নাটালির দেওয়া সংবাদের প্রিন্ট করা ফাইলের মধ্যে পেয়েছিল। প্রচারণায় যুক্ত কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ওপর নাটালির অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। পরে চিঠির কিছু অংশ নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশ করে।

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইংল বলেন, নাটালি হার্প ট্রাম্পের দলের অন্যতম বিশ্বস্ত ও কঠোর পরিশ্রমী কর্মী। ফেক নিউজের এই আক্রমণ সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমার বড় প্রমাণ। মুখপাত্র একইসঙ্গে ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন অসিফের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সম্প্রতি নাটালির সঙ্গে ট্রাম্পের সফর নিয়ে প্রকাশ্যে কটাক্ষ করেছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বার্ষিক দেড় লাখ ডলার বেতনের এই সহকারী কোনো ধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়াই কাজ করছেন। তার কাছে ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টের ব্যাকঅ্যাক্সেসও রয়েছে। তার চিঠির লেখার শৈলীর সঙ্গে ট্রাম্পের পোস্টগুলোর অদ্ভুত মিল দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *