টানা ৭ম দিনেও ইতালির মাউন্ট এটনায় অগ্ন্যুৎপাত

ইউরোপের সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট এটনা থেকে টানা সপ্তম দিনের মতো লাভা ও ছাই নির্গত হচ্ছে। ইতালির সিসিলি দ্বীপের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত আগ্নেয়গিরিটির অগ্ন্যুৎপাত দেখতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক সেখানে ভিড় করছেন। তবে লাভার প্রবল স্রোত ও কালো ধোঁয়ার মেঘের কুণ্ডলীর দৃশ্য যতটা ভয়াবহ মনে হচ্ছে, পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ততটা বিপর্যয়কর নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট ঘন কালো ছাইয়ের মেঘ ইতোমধ্যে সিসিলির যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছে। কাতানিয়া-ফন্তানারোসা বিমানবন্দরে বহু ফ্লাইট বাতিল বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ছাইয়ের কারণে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়েছে।

মাউন্ট এটনায় এ ধরনের অগ্ন্যুৎপাত অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরি হিসেবে এটি বছরে বেশ কয়েকবার অগ্ন্যুৎপাত করে। কখনও কখনও এক মাসেই একাধিকবার অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকেও এটনা থেকে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল।

কাতানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি গবেষক জর্জিও কস্তা বলেন, গত ছয় বছরে এটনায় ৭০টির বেশি তীব্র অগ্ন্যুৎপাত বা ‘প্যারক্সিজম’ ঘটেছে।

এ ধরনের অগ্ন্যুৎপাতে লাভার ফোয়ারা কয়েকশ’ মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠতে পারে এবং ছাইয়ের মেঘ কয়েক কিলোমিটার উচ্চতায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এসব তীব্র অগ্ন্যুৎপাত।

কস্তার মতে, বর্তমানে এটনার যে ধরনের অগ্ন্যুৎপাত চলছে, তা মূলত আগ্নেয়গিরিটির স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে, ছাইয়ের পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং অল্প পরিমাণে হাইড্রোজেন সালফাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড ও হাইড্রোজেন ফ্লোরাইডের মতো গ্যাস নির্গত হয়।

এসব উপাদানের কারণে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ বলে মনে হতে পারে। তবে এর বাস্তব প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো কিছু আগ্নেয়গিরিজাত গ্যাস বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ মানুষের কর্মকাণ্ডের তুলনায় খুবই কম। নাসার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর সব আগ্নেয়গিরি মিলে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে, মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে তার প্রায় ১০০ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সরাসরি সম্পর্কও নেই বলে জানিয়েছেন কস্তা। তার ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনসহ আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলির সঙ্গে পৃথিবীর আগ্নেয়গিরি বা ভূতাত্ত্বিক কার্যক্রমের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

এটনার বর্তমান অগ্ন্যুৎপাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়া আগ্নেয় ছাই ও ছোট পাথরের টুকরা, যাকে ‘ল্যাপিলি’ বলা হয়। এগুলো বাতাসের সঙ্গে আগ্নেয়গিরির আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সাধারণত দুই থেকে ৬৪ মিলিমিটার আকারের ছোট আগ্নেয় পাথরকে ল্যাপিলি বলা হয়।

কস্তার মতে, ছাই ও ছোট ল্যাপিলি সরাসরি খুব বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করলেও ছাইয়ের সূক্ষ্ম কণা বাতাসে মিশে গেলে তা শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ কারণে ছাইয়ের ঘনত্ব বেশি হলে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে আগ্নেয় ছাইয়ের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে বিমান চলাচলে।

বিমান ছাইয়ের মেঘের মধ্য দিয়ে উড়লে সূক্ষ্ম কণাগুলো ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে উচ্চ তাপমাত্রায় গলে যেতে পারে। এতে ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ইঞ্জিনের শক্তি কমে যেতে পারে, এমনকি, ইঞ্জিন বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই এটনার আশপাশের আকাশে ছাই ছড়িয়ে পড়লে কাতানিয়া বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।

বিমান চলাচলের জন্য বিপজ্জনক হলেও এটনা থেকে নির্গত ছাই ও অন্যান্য আগ্নেয় উপাদান কৃষি ও পরিবেশের জন্য উপকারী হতে পারে।

এটনার ছাইয়ে প্রচুর খনিজ উপাদান রয়েছে। মাটিতে মিশে এটি প্রাকৃতিক সারের মতো কাজ করে। একই সঙ্গে মাটির পানি নিষ্কাশন এবং পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

এ কারণেই সিসিলির উর্বর মাটিতে আঙুর, পেস্তা ও বিভিন্ন ধরনের সাইট্রাস ফল চাষে আগ্নেয় ছাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অঞ্চলটির বিখ্যাত ওয়াইন ও কৃষিপণ্যের পেছনেও এই আগ্নেয় মাটির অবদান রয়েছে।

সান দিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির গবেষণায় দেখা গেছে, আগ্নেয় ছাই শুধু মাটিতে পুষ্টি উপাদান যোগ করার কাজই করে না; পরিবেশ ও কৃষিব্যবস্থায় এর আরও বিস্তৃত ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।

অর্থাৎ, এটনার অগ্ন্যুৎপাত, একদিকে যেমন বিমান চলাচল ও জনস্বাস্থ্যে সাময়িক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে সিসিলির মাটিকে আরও উর্বর করে তুলতেও ভূমিকা রাখে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *