শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাত্র ৮ রানের মধ্যে নেই ৩ উইকেট। ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে তখন চরম চাপে বাংলাদেশ নারী দল। তবে সেখান থেকেই দৃঢ়তা, ধৈর্য আর দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ম্যাচে ফেরে টাইগ্রেসরা। অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ও সোবহানা মোস্তারির দুর্দান্ত জুটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে লড়াকু সংগ্রহ গড়েছে বাংলাদেশ। সোবহানা তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে সেঞ্চুরি। তার শতকের সঙ্গে জ্যোতির অপরাজিত ইনিংসে ভর করে ৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ২২০ রান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য ২২১ রান।
আজ রোববার (১১ অক্টোবর) ব্রিসবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। তবে ইনিংসের শুরুতেই একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। ৭.২ ওভার শেষে স্কোরবোর্ডে মাত্র ৮ রান, অথচ সাজঘরে ফিরে গেছেন তিন ব্যাটার। ফারজানা হক ১৩ বল খেলে কোনো রান করতে পারেননি। শারমিন সুলতানার ব্যাট থেকে আসে ৫ রান, আর শারমিন আক্তারও রানের খাতা খুলতে পারেননি। এমন বিপর্যয়ে বাংলাদেশের ইনিংস বড় সংগ্রহের পথে এগোবে, সেই আশা তখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল।
ঠিক সেই কঠিন পরিস্থিতিতেই দলের হাল ধরেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি ও সোবহানা মোস্তারি। উইকেট বাঁচিয়ে খেলার পাশাপাশি সুযোগ বুঝে রান তোলার কৌশলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন দুজন। তাঁদের ব্যাটিংয়ে একদিকে যেমন চাপ সামাল দেয় বাংলাদেশ, অন্যদিকে তেমনি বদলে যেতে থাকে ম্যাচের চিত্র।
সোবহানা ছিলেন ইনিংসের প্রধান আকর্ষণ। শুরুতে উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলে ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এই টপ অর্ডার ব্যাটার। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সঙ্গে দারুণ সব বাউন্ডারিতে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৩৪ বলে ১১৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন সোবহানা। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৮টি চার। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি, যা বাংলাদেশের ইনিংসকে শক্ত ভিত এনে দেয়।
অন্য প্রান্তে অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন অধিনায়ক জ্যোতি। শুরুতে তিন উইকেট হারিয়ে যখন দল বিপাকে, তখন ইনিংস গুছিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। সোবহানার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে বাংলাদেশের স্কোর এগিয়ে নেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী রান তোলার চেষ্টা। ১১৪ বলে ৭৪ রান করে অপরাজিত থাকেন জ্যোতি। তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার।
এক পর্যায়ে ৮ রানে ৩ উইকেট হারানো বাংলাদেশকে দুই শতাধিক রানের সংগ্রহ এনে দেন এই দুই ব্যাটার। তাদের জুটিই ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শুরুর বিপর্যয়ের পর বড় জুটি গড়ে দলকে লড়াইয়ে ফেরানো ছিল বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। সোবহানার সেঞ্চুরি আর জ্যোতির দায়িত্বশীল ব্যাটিং মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সামনে অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার মতো লক্ষ্য দাঁড় করাতে পেরেছে বাংলাদেশ।
সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পরও ইনিংসকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন সোবহানা। তবে ৪৭.৫ ওভারে ২০৩ রানে দলের চতুর্থ উইকেট হিসেবে বিদায় নেন তিনি। তাঁর আউটের পর বাংলাদেশের রান তোলার গতি কিছুটা কমে আসে। শারমিন আক্তার ৭ বলে ৮ রান করে ফিরে যান। শেষ দিকে উইকেট হারালেও জ্যোতি অপরাজিত থাকেন এবং তাঁর ইনিংসের ওপর ভর করেই নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২২০ রান।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন মেগান শুট। তিনি তুলে নেন তিনটি উইকেট। কিম গার্থ পেয়েছেন একটি উইকেট। শুরুতে বাংলাদেশের টপ অর্ডারকে দ্রুত ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জ্যোতি ও সোবহানার প্রতিরোধে সেই সুবিধা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসটি ছিল দুই ভিন্ন চিত্রের গল্প। একদিকে মাত্র ৮ রানে ৩ উইকেট হারানোর হতাশা, অন্যদিকে সেখান থেকে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন। সোবহানার প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি এবং জ্যোতির অপরাজিত ৭৪ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে লড়াই করার মতো পুঁজি এনে দিয়েছে।