গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের ‘নৃশংসতার’ দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্যের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন এবং ১১ দলের নেওয়া কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন এবং এক হাজার ৪০০ এর অধিক মানুষ জীবন উৎসর্গ করেন। অসংখ্য মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত গণআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হলেও এর বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার প্রক্রিয়ার পক্ষে মত দিয়েছে, তা উপেক্ষা করে সরকার সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে। এটি জাতির সাথে প্রতারণা। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে পুনরায় এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
বিচার প্রসঙ্গে ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জুলাই-আগস্টের গণহত্যাকাণ্ডসহ অতীতের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম প্রত্যাশিত অগ্রগতি লাভ করেনি। তিনি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান।
প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে ড. হামিদুর বলেন, বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। দুর্নীতির সুযোগ বন্ধে ও সুশাসনের ব্যবস্থা না করে জনগণের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী সেমিনার, চিত্র প্রদর্শনী, স্মৃতিচারণমূলক সমাবেশ, মানববন্ধন, বিভাগীয় সমাবেশ, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল।
ঘোষিত কর্মসূচিগুলো হলো-
১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলা ও মহানগর পর্যায়ে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচার দাবিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। গ্রাফিতি অঙ্কন করা হবে।
৪ জুলাই রাজধানী ব্যতিত সব জেলা ও মহানগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হবে।
৬ জুলাই জাতীয় সংসদের সামনে শহীদ পরিবারের উদ্যোগে মানববন্ধন আয়োজন ও জাতীয় সংসদের স্পিকার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান।
৮ জুলাই জাতীয় সেমিনার আয়োজন।
২৭ জুন ময়মনসিংহে বিভাগীয় সমাবেশ।
১১ জুলাই রংপুরে বিভাগীয় সমাবেশ।
১৮ জুলাই বরিশালে বিভাগীয় সমাবেশ।
২০ জুলাই নারীদের অংশগ্রহণে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের অবদান শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
২৩, ২৪ ও ২৫ জুলাই চিত্র প্রদর্শনী এবং জুলাই আন্দোলনের সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থলগুলোতে স্মৃতিচারণমূলক সমাবেশ আয়োজন করা হবে।
২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ।
৩১ জুলাই দেশব্যাপী মসজিদে দোয়া ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
৫ আগস্ট রাজধানীসহ সারাদেশে জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে ড. হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, এটি কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়; বরং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আমরা দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতা আরিফুল ইসলাম আদিব, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর আব্দুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, খেলাফত মজলিসের নেতা আনোয়ার হোসেন, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, বিডিপির সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম প্রমুখ।