জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমামতো প্রিফেকচারে ৭.১ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর ফলে হাজার হাজার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বন্ধ রয়েছে রেল চলাচল। খবর বিবিসি, আল জাজিরা ও এনএইচকে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর সমুদ্র উপকূলে ১ মিটার (৩.৩ ফুট) পর্যন্ত উঁচু ঢেউয়ের আশঙ্কায় এই সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে এটি তুলে নেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল কুমামোটো শহরের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত উকি শহরে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬.২ মাইল) গভীরে।
ভূমিকম্পের পরপরই জাপানের কুমামোটো শহরের একটি শপিংমলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। প্রধান খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘এইওন’ জানিয়েছে, তারা কাশিমা শহরের ‘এইওন মল কুমামোটো’তে একটি বিস্ফোরণের খবর পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে গ্রাহকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তারা সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে।
এদিকে দমকল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতায় শপিং মল ভবনটির দ্বিতীয় তলার একাংশ ধসে পড়েছে। এর ফলে ভবনের ভেতরে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাপানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এনএইচকে-র একটি হেলিকপ্টার থেকে তোলা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শক্তিশালী এই বিস্ফোরণের কারণে শপিং সেন্টারটির বাইরের দেওয়ালের কিছু অংশ ধসে খসে পড়েছে, যা দেখে ভবনটির মূল কাঠামো বলে মনে হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা বর্তমানে আটকা পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে কাজ চালাচ্ছেন।
কুমামোটো শহরের মিনামি ওয়ার্ডের একটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্প ও এর পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির জেরে এ পর্যন্ত ৫০ জনেরও বেশি মানুষকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে অন্তত একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তিনি বর্তমানে অচেতন অবস্থায় রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান চলার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে আহতদের আসার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, কুমামোটো অঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রভাবে একটি ফুটব্রিজ (পথচারী পারাপার সেতু) ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় প্রকাশিত একটি ছবিতে ভূমিকম্প পরবর্তী এই ফুটব্রিজ ধসের দৃশ্য দেখা গেছে।
তবে এই ফুটব্রিজটি ঠিক কখন ধসে পড়েছে এবং এর ফলে কোনো পথচারী আহত বা হতাহত হয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জাপান সরকার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপের কুমামতো, নাগাসাকি, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা, ওইতা এবং মিয়াজাকি প্রিফেকচারের জন্য জরুরি ভূমিকম্প সতর্কতা জারি করেছে। দ্য জাপান টাইমস জানিয়েছে, কুমামোটো শহরসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকার বাসিন্দাদের একই মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের সম্ভাবনার জন্য সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সরকার যত দ্রুত সম্ভব ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য কাজ করছে।
এদিকে ভূমিকম্পের পরপরই প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রেল কোম্পানি জেআর কিউশু জানিয়েছে, তারা তাদের দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনসহ অন্যান্য রেল পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। তবে পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কোনো অনিয়ম বা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, সনি ও বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা টিএসএমসি-সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক কোম্পানির কারখানা এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। তবে কোনো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১০ বছর আগে এই কুমামোটোতে দুটি বড় ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং দুই হাজার ৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন।
জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ, যা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকাকে আংশিকভাবে ঘিরে থাকা আগ্নেয়গিরি ও সামুদ্রিক খাতের ‘রিং অফ ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বে ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় ২০ শতাংশই জাপানে ঘটে থাকে।