চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে এসব চেক হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের অর্থের চেক ও সরকারি মানবিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, এই ঘটনায় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখনও তদন্ত কমিটি কাজ করছে৷ তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপশি এই শিল্পকে কীভাবে আরও সুরক্ষিত রাখা যায়, সেই ব্যাপারে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
গত ১৪ আগস্ট ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে হঠাৎ বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা আক্রান্ত হন। এরপর ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘মানুষের জীবনের কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। তার পরও উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে কোনো পরিবার যেন পথে না বসে কিংবা অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য না হয়, সে জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
আহত শ্রমিকদের চিকিৎসায় যাতে কোনো ঘাটতি না থাকে, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন জেলা প্রশাসক। গুরুতর আহত দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল প্রশাসন, ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ ও জাহাজভাঙা শিল্পমালিকদের সংগঠনের সঙ্গে চিকিৎসার বিষয়ে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন।
ঘোষিত ১০ লাখ টাকার মধ্যে দুর্ঘটনার পর পরই পরিবারগুলোকে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। শিল্পনীতির বিধান অনুযায়ী দুই লাখ টাকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি সাত লাখ টাকার চেক পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয় আজ।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিধান অনুযায়ী সীতাকুণ্ডে বসবাসকারী পাঁচ নিহত শ্রমিকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অন্য পাঁচটি পরিবার তাদের স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে একই পরিমাণ অর্থ পাবে।
জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী নিহত শ্রমিকরা হলেন পাবনার সুজানগরের মো. আবদুল আলিম সুজন (৩৬), জামালপুরের ইসলামপুরের হাবিবুর রহমান (৫২), চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর মো. মনছুর (৫৬), মো. নাসির উদ্দিন (৫১) ও পলাশ দাশ (৩৯), দক্ষিণ সোনাইছড়ির মতিউর রহমান (১৭), মির্জানগর জেলেপাড়ার সানি দাশ (২০), গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মো. খোকন মিয়া (২৩), গাইবান্ধা সদরের মো. রানা মিয়া (২৩) এবং জামালপুর সদরের মো. ইদ্রিস আলী (৫০)।
নিহত শ্রমিকদের বয়স ১৭ থেকে ৫৬ বছরের মধ্যে। তাঁদের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ছাড়াও পাবনা, জামালপুর ও গাইবান্ধা জেলায়। তাঁদের স্ত্রী, মা অথবা বাবাকে উত্তরাধিকারী বা নমিনি হিসেবে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের লক্ষ্য জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘জিরো ক্যাজুয়ালটি’ বা শূন্য প্রাণহানির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে এখানে যারা কাজ করেন, তাদের জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।”
দুর্ঘটনাটি হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে ঘটেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, গ্যাসটি তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদে অপসারণের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের ছিল না। স্থানীয় বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের কাছেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ছিল না। বিশেষ করে এলএনজি ও অন্যান্য গ্যাসবাহী জাহাজ কেনা এবং কাটার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিষাক্ত গ্যাস শনাক্ত ও নিরাপদে অপসারণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী নিহত শ্রমিকদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে শিল্পে নিয়োজিত সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ দুর্ঘটনার জন্য ক্ষমা চান। নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পাশে থাকা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।