উত্তপ্ত রাবি : রাকসু ভবন ও লাইব্রেরিতে সংঘর্ষ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু) কার্যালয়ে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারসহ এক নেতার ওপর হামলার অভিযোগে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা ও বিক্ষোভের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এ ঘটনায় রাকসু জিএসসহ চারজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

রাকসু জিএসের দাবি, অভিযুক্ত এক ছাত্রলীগকর্মীকে পুলিশে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আজ সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু ভবন ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।

নারীঘটিত ইস্যুতে এক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমানের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তার মোবাইল ফোন তল্লাশি করে তাকে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে শনাক্ত করা হয় বলে অভিযোগ ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীদের। এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও তার সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীরা। উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গতকাল রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী ছাত্রদলকর্মী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রক্টর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের বিষয়ে আলোচনা করতে প্রক্টর দপ্তরে আসেন সাবেক ছাত্রলীগকর্মী ও বর্তমানে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আনাস। এ সময় প্রক্টরের সঙ্গে আনাসের বাকবিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রক্টর তাকে দপ্তর থেকে বের হয়ে যেতে বলেন।
আজ দুপুর ১২টার দিকে অভিযোগের বিষয়ে মহসিন আলমের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাকে প্রক্টর দপ্তরে তলব করা হয়। এ সময়ও আনাস সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আবারও প্রক্টরের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার তাকে মারধর করেন। এরপর ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আনাসকে গ্রেপ্তার করতে প্রক্টর দপ্তরে আসে পুলিশ। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রক্টর পুলিশকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

এরপর আনাস প্রক্টর দপ্তর থেকে বের হয়ে কিছু সময় পর ছাত্রদলের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে রাকসু ভবনে অবস্থানরত নেতাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে। এতে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার এবং সহ-বিজ্ঞান সম্পাদক নাজমুস সাকিব আহত হন।

এরপর উভয় পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে চলে যায়। সেখানে রাকসুনেতা ও আনাসের নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। একপর্যায়ে আনাস ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে আশ্রয় নিলে রাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে প্রবেশ করে তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান এবং জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে আহত এক সাবেক ছাত্রলীগনেতাকে হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ করে দেন প্রক্টর। হাসপাতালে নেওয়ার পথেও তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এরপর সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘সেইফ এক্সিট’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন রাকসু ও হল সংসদের নেতারা।

এ ঘটনায় উপাচার্যের সঙ্গে শিবির, রাকসু ও হল সংসদের নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা), উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ছাত্র উপদেষ্টা, প্রক্টরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় আহত রাকসুর সহ-বিজ্ঞান সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, ‘আনাস প্রক্টর অফিস থেকে বের হয়ে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীসহ রাকসু ভবনে এসে জিয়া হলের জিএস আরিফকে খুঁজতে থাকে। আমি বলি, আরিফ জিয়া হলে থাকবে, রাকসু ভবনে কেন খুঁজতে আসছেন। এরপর আনাসসহ কয়েকজন রাকসু জিএসের কক্ষে গিয়ে তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে আনাসের সঙ্গে থাকা ছাত্রদলের কয়েকজন মিলে আম্মারের ওপর হামলা করে রাকসু ভবন থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির দিকে চলে যায়। এরপর প্রক্টর স্যার ওদের সেইফ এক্সিট দিয়েছেন।’

সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আজকের মধ্যেই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাব।’

যা বলছেন হামলার শিকার শিক্ষার্থী

হামলার শিকার শিক্ষার্থী আনাস বলেন, প্রক্টর দপ্তরে তাকে ছাত্রলীগকর্মী আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। পরে গ্রন্থাগারেও তার ওপর হামলা চালানো হয়। তার দাবি, তিনি ছাত্রলীগেরকর্মী নন। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি কখনও সংগঠনটির ব্যানার বা কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন না।
শিবির ও রাকসু নেতাদের বক্তব্য

রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘সবাইকে প্রচার করতে দেখছি অনেকে বলছে আমরা মার খেয়েছি বা আহত হয়েছি কিন্তু আমরা মাইর খাইনি, মাইর দিয়েছি। প্রশাসনের হাতে আইন তুলে দিয়ে কোনো লাভ হলো না।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরের কেউ জড়িত ছিল না। রাকসু নেতাদের ওপর হামলার খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই।’ তবে হামলার ভিডিওতে ছাত্রশিবিরের নেতাদের দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

যা বলছে ছাত্রদল

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মতো একটি স্থানে হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

প্রশাসনের বক্তব্য

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ‘দিনব্যাপী যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এখন পুলিশ প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে একটি সভায় বসেছি। দ্রুত সময়ের ভেতর এই ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *