আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে ট্রাম্পের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন : নাভি পিল্লাই

এবছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধিকারকর্মী ও আইনবিদ নাভানেথাম নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা ‘বেআইনি’ নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করেছেন। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাভি পিল্লাই বলেন, তার নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঘটনাটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। তার ভাষায়, এটি ছিল ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কার না দেওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়া’।

ট্রাম্পের জন্য তার কী বার্তা রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ৮৫ বছর বয়সী এই বিচারক এএফপিকে বলেন, ‘আপনার আইন উপদেষ্টাদের ডেকে আনুন, যাতে তাঁরা আপনাকে আন্তর্জাতিক আইন কী, তা বুঝিয়ে বলতে পারেন।’

নাভি পিল্লাই বলেন, ‘তাঁর উপদেষ্টাদের ডেকে বলা উচিত, কেন আমরা মনে করি একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক আদালতের কাজে হস্তক্ষেপ করা তার জন্য বেআইনি।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এর লক্ষ্য আদালতটির দৈনন্দিন কার্যক্রম পঙ্গু করে দেওয়া। এই আদালতে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা হয়।

ট্রাম্প প্রশাসন আদালটিকে ‘ইটের পর ইট খুলে’ ধ্বংস করার অঙ্গীকার করেছে। গাজায় কথিত অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় ট্রাম্প প্রশাসন বেশ ক্ষুব্ধ।

নাভি পিল্লাই উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রশাসনগুলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এটা বেছে বেছে এক পক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা, এটা দ্বৈত নীতি এবং এটা ভুল।’

আদালতের প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রভাব ফেলার এই নিষেধাজ্ঞা ছয় মাস পর কার্যকর হবে। এ সময়ের মধ্যে আদালতের সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেন। আদালতটির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে।

তবে নাভি পিল্লাই বলেছেন, আইসিসির সংস্কারের ধারণাটি ‘বাস্তব বিষয়কে আড়াল করার একটি মার্জিত শব্দচয়ন’। তাঁর মতে, ট্রাম্প আসলে যে নিশ্চয়তা চান, তা হলো—আদালত যেন মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত না চালায়।

পিল্লাই এএফপিকে বলেন, ‘আপনি তা করতে পারেন না, কারণ দ্বৈত নীতি চলতে পারে না। একদল মানুষের বিরুদ্ধে বেছে বেছে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, আর অন্যদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে না—এটা হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি অত্যন্ত খারাপ ও বিপজ্জনক একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।’

‘অপমানজনক আঘাত’

জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের (সিওআই) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন পিল্লাই। তার নেতৃত্বাধীন কমিশন গত বছর জানিয়েছিল, গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে।

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালে নাভি পিল্লাই তাদের বক্তব্যেরও কড়া জবাব দেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাকে ‘গোঁড়া বিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে, ‘নাৎসি প্রচারক জোসেফ গোয়েবলস তার এই পুরস্কার দেখে নরক থেকে হাততালি দিচ্ছেন।’

এ প্রসঙ্গে নাভি পিল্লাই বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি অত্যন্ত আঘাতমূলক ও অপমানজনক। গোয়েবলসের হাতে রক্ত লেগে ছিল… হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য তিনি দায়ী ছিলেন। শুধু ইহুদিদের নয়, আমার মতো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদেরও রক্তের দাগ ছিল তার হাতে।’

নেতানিয়াহু আইসিসির অভিযোগের মুখোমুখি হতে আদালতে হাজির হবেন কি না, সে বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে নাভি পিল্লাই স্বীকার করেন। নেতানিয়াহু অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে তীব্রভাবে অস্বীকার করেছেন।

তবে নেতানিয়াহু কখনো আইসিসির কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পিল্লাই বলেন, ‘সারা জীবন আমি মানুষকে নানা বাধা অতিক্রম করতে দেখেছি। তাই আমি আশাবাদী, এটি ঘটবে।’

‘বয়স আমাকে কিছুটা গুটিয়ে নিচ্ছে’

নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের খবরটি তিনি এখনো পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারেননি বলে জানান নাভি পিল্লাই। প্রথমে তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে তিনি এই পুরস্কার পেয়েছেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘তারা খুব কমসংখ্যক নারীকে এই পুরস্কার দিয়ে থাকেন—এ পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য রয়েছে।’

৮৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পক্ষে বিশ্বজুড়ে প্রচার চালানোর সামর্থ্য কমে আসতে পারে বলে নাভি পিল্লাই কিছুটা উদ্বিগ্ন। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী হিসেবেতাঁর বক্তব্য আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হলেও শারীরিক সক্ষমতা তাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

নাভি পিল্লাই বলেন, ‘আমার মনে হয়, বয়স আমাকে কিছুটা সীমাবদ্ধ করবে। আগে যতটা সক্রিয় থাকতে পারতাম, এখন আর ততটা পারব না।’

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার থাকাকালে তিনি ৭৯টি দেশ সফর করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন।

১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা যায়, তা নিয়ে নাভি পিল্লাই বিভিন্নজনের সঙ্গে পরামর্শ করছেন। তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থের একটি অংশ তার জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনিয়োগ করা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আফ্রিকা ভুগছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও ভুগছে। সেখানে তহবিল সংগ্রহ করা খুব কঠিন।’

শান্তিতে নোবেল জয়ী নাভি পিল্লাই আরও বলেন, ‘কোয়াজুলু-নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় আমার নামে একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই তাদের সঙ্গে আমি আলোচনা শুরু করব। আমি শিশু ও তরুণদের শিক্ষায় বিশ্বাস করি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *