ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের জন্য একটি নতুন সাময়িক রুটের বিষয়ে একমত হয়েছে ইরান ও ওমান। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত এই জলপথটি উন্মুক্ত করা হবে না। খবর আলজাজিরার।
ইরানের আইনি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদির এই মন্তব্য মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এসেছে। এর আগে প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পর্যায়ক্রমিক কাঠামোর চূড়ান্ত বিবরণ নিয়ে আলোচনা করতে ইরান ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তেহরানে বৈঠকে বসেন।
হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় দুই দেশ ইরান ও ওমান এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে কিছুদিন পরপরই আলোচনা করে আসছে। ফেব্রুয়ারিতে তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস চালানের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই বাহিত হতো। ওই সময় থেকেই এই প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ঘরিবাবাদি বলেন, নতুন এই রুটের প্রবেশপথ ‘আমাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে হবে এবং বহির্গমন রুটের একটি অংশও আমাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে’ বলে সম্মত হয়েছে ইরান ও ওমান। কাজেম ঘরিবাবাদি জানান, এই ট্রানজিট করিডোরটি ৭ মাইল (১১.৩ কিলোমিটার) প্রশস্ত হবে। তিনি আরও যোগ করেন, ওমানের সাথে সম্মত হওয়া এই ট্রানজিট রুটটি একটি সাময়িক পথ।
একটি যৌথ বিবৃতি অনুসারে, মঙ্গলবার দিনের শুরুতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তেহরানে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সাময়িক নৌ চলাচল করিডোর এবং প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের একটি ‘প্রকল্প’ নিয়ে আলোচনা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ আলবুসাইদি আশা প্রকাশ করে জানান, দেশ দুটি শিগগিরই এই করিডোর চালুর ঘোষণা দেবে। তিনি আরও বলেন, প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং একটি স্থায়ী সমাধান যথাসময়ে অনুসৃত হবে। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা এবং নৌ চলাচল ও নিরাপত্তা পরিষেবাসহ একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিগত আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে ছড়িয়ে থাকা মাইন প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের জবাবে তেহরান জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার পর হরমুজ প্রণালি তীব্র উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এরপর তারা ১৯৬৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম’ এড়িয়ে তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে একটি নতুন শিপিং রুট ঘোষণা করে।
তেহরান জানিয়েছিল, ওই রুটে মাইন পোঁতা হয়েছিল। পরবর্তীতে জুনে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলে, ওমান এবং আইএমও মার্কিন সমর্থনে হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন ট্রানজিট করিডোর ঘোষণা করে—যা ওমান উপকূল ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছিল। ইরান অভিযোগ করে যে, এই তথাকথিত ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট’ সমঝোতা স্মারকের চরম লঙ্ঘন এবং তারা এই করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়, যার ফলে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে একটি ব্যাপকভিত্তিক শান্তি চুক্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়ে এবং প্রণালির মধ্য দিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য নজরদারি সংস্থা জানায়, প্রণালির প্রবেশপথের কাছে ওমানের আশ শিসাহ্-এর কাছে একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি তেল ট্যাঙ্কার অকেজো হয়ে পড়ে।
মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে কাজেম ঘরিবাবাদি বলেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইরান এই প্রণালিকে উন্মুক্ত বলে গণ্য করবে না। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে সমস্ত মাইন অপসারণ করা হয়েছে। ঘরিবাবাদি বলেন, এই দাবি কেবল ‘বাজার শান্ত করার’ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন মাইন শনাক্তকারী জাহাজগুলো যদি এই এলাকায় প্রবেশ করে, তবে সেগুলো ‘খুব ভালো লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হবে।
কাজেম ঘরিবাবাদি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কূটনৈতিক পথে ফিরে আসতে চায়, তবে সমঝোতা স্মারকের অধীনে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ ইরানি সম্পত্তি মুক্ত করার মতো বিষয়গুলো। তিনি দেশগুলোকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান।
ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং যে কোনো দেশকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করলে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে কাজেম ঘরিবাবাদি বলেন, ‘ওয়াশিংটন আমাদের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা চাপাতে চায়, সে বিষয়ে মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার জন্য আমরা দেশগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াশিংটন আমাদের প্রতিবেশীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সামর্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণায় রয়েছে।’
কাজেম ঘরিবাবাদি বলেন, ট্রাম্পের অধীনে এর আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অভিযান তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল এবং নতুন পদক্ষেপগুলোর পরিণতিও একই হবে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং এগুলো মোকাবিলা করার জন্য আমাদের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।’