সাড়ে ৬ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ হাজার ৭১২ জন

২০২০ সাল থেকে গেল জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৭১২ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ১৪৩ জন।

আজ শনিবার (৮ আগস্ট) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ সালে। ওই বছর ৩ হাজার ২৯টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হন। ২০২২ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৭৩টি এবং নিহত হন ৩ হাজার ৯১ জন।

২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন, ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ২১৪ জন এবং ২০২৩ সালে ২ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৮৭ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬০৯ জন নিহত হন। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ৩১১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ জন।

ভারী যানবাহনের ধাক্কায় বেশি দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় অংশ ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়। মোট ৬ হাজার ৩১৪টি দুর্ঘটনা, অর্থাৎ ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এ কারণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মোটরসাইকেল চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে ৫ হাজার ৪৯৭টি (৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ) এবং মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ হাজার ৫৪৮টি (২২ দশমিক ৮ শতাংশ) দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি দুর্ঘটনা।

সড়কের মাঝে বিদ্যুতের খুঁটি, দেড় বছরে শতাধিক দুর্ঘটনা

দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের হিসাবেও পণ্যবাহী যানবাহন এগিয়ে। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিসহ পণ্যবাহী যানবাহন ৬ হাজার ৪৮১টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ছিলেন ৫ হাজার ৮৩১টি দুর্ঘটনায়, যা ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। বাসের চালক ২ হাজার ১৬৪টি, তিন চাকার যান ৭৩২টি এবং প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ ৪৩৮টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আঞ্চলিক সড়কে বেশি দুর্ঘটনা

সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এ ধরনের সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি, অর্থাৎ ৪১ দশমিক ৬৩ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ৪ হাজার ৭৭৩টি (২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ), শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি (১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ) এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি (১২ দশমিক ১৮ শতাংশ) দুর্ঘটনা।

আক্রান্তদের বড় অংশ তরুণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সংগঠনটির মতে, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। গণপরিবহণের সীমাবদ্ধতা, যানজট এবং সহজে চলাচলের সুবিধার কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন না মানা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সড়কের ত্রুটি, নজরদারির ঘাটতি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সংগঠনটির দাবি, মোটরসাইকেল চার চাকার যানবাহনের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার না করাও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির অন্যতম কারণ। তাদের মতে, মানসম্পন্ন হেলমেট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

নিরাপদ সড়কে আট দফা সুপারিশ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণা, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *