যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধের ফলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছেন ইরানের নেতারা। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের কারণে তাদের বৈদেশিক বাণিজ্য এক-তৃতীয়াংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) তেহরান মার্কিন চাপের মুখে নতিস্বীকার না করার ইঙ্গিত দিয়ে সহনশীলতা প্রদর্শন, কূটনীতি বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় এই স্বীকারোক্তিগুলো আসে। খবর আলজাজিরার।
ইরানের সরকার জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমানোসহ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোই এখন তাদের কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানি বন্দর অবরোধের কারণে তাদের আমদানি-রপ্তানি প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে তিনি বলেন, গত জুনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত স্বল্পমেয়াদী সমঝোতা স্মারকের সময় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তেল বিক্রির অনুমতি দেওয়া হলে ইরান প্রায় ৯০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সরকারকে এই সংকট মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর এবং প্রথম দিনের হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। মোজতবা খামেনির একটি লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অর্থনৈতিক ও জীবিকাসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো- যেমন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, পণ্যের মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সেবা ক্ষেত্রগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে সংস্কার করা প্রয়োজন।’
গত মাসে ইরানের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তেহরানের বাসিন্দারা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। মরিয়ম নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘যুদ্ধের আগে আমি কাজ করতাম না। কিন্তু যুদ্ধের পর থেকে সংসার চালাতে আমাকে চাকরি খুঁজতে হয়েছে। সবকিছুর দাম অনেক বেড়ে গেছে।’ খাদ্য ব্যবসায়ী ওমিদ জানান, বাড়িভাড়া বাড়ার সাথে সাথে ব্যবসাও মন্দা হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছি।’
কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা
আজ শনিবার এক বিবৃতিতে ইরানের সরকার কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাকে জাতীয় স্বার্থ ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার জন্য দুটি পরিপূরক, সমন্বিত ও অবিচ্ছেদ্য ডানা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে যে, তারা উভয় নীতিই ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তেহরান থেকে আলজাজিরার সিনেম কোসেওগ্লু জানিয়েছেন, সরকার জাতীয় ঐক্যের বার্তা প্রচার করছে। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর সাসঙ্গে সংলাপ এবং কম সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। পেজেশকিয়ান বলেছেন, তাদের কেউ কারও ওপর শাসন করছে না এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন।
এদিকে, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জসিম আল থানি বৃহস্পতিবার তেহরানে ইরানি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার আলোচনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় নৌচলাচল উন্মুক্ত করার ওপর জোর দেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই আলোচনাকে গঠনমূলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান আমির হাতামি ফার্স নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, শত্রুরা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার চেষ্টা করলেও, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণ শক্তিতে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা বলেন, “ইরানের কাছে কিছু ‘চমক’ জমা রয়েছে। সবার বিশেষ করে শত্রুদের জানা উচিত যে, তারা যথাসময়ে ইরানের এই চমকগুলো দেখতে পাবে।”