চার দিন আগেও যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে সপ্রাণে কথা বলছিলেন, জীবনদর্শনের কথা শুনিয়েছিলেন আজ তিনি আর নেই। চিরচেনা সেই ধবধবে সাদা শার্ট, গলায় আলগা প্যাঁচানো সাদা উর্নি, কপালে লাল তিলক আর চোখে গোল ফ্রেমের চশমা পরা মানুষটিকে সেদিন দেখে কে ভেবেছিল, সেটাই হবে তাঁর শেষ মঞ্চ বক্তৃতা! গত বৃহস্পতিবার গোয়ার নিজ বাড়ি থেকে ৭৫ বছর বয়সি এই গুণী অভিনেতার অচৈতন্য দেহ উদ্ধার করা হয়।
এর মাত্র চার দিন আগে, গত রবিবার গোয়ার ডোনা পাওলাতে একটি থিয়েটার ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন নানা পটেকর। মারাঠি থিয়েটারের মাধ্যমেই অভিনয়ে আসা এই অভিনেতার থিয়েটারের প্রতি সবসময়ই ছিল তীব্র ভালোবাসা। ‘সম্রাট ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ক্লাব’-এর সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমে নাট্যজগতের স্মৃতিচারণ করলেও, ধীরে ধীরে তাঁর কথায় চলে আসে জীবন ও মৃত্যুর নির্মম সত্য।
অনুষ্ঠানে নাট্যব্যক্তিত্ব ড. লাগু তেন্ডুলকরকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন নানা। তিনি বলেছিলেন, “এ পেশায় সবসময় নতুন কিছুর সন্ধান করবে। নিজের নীতি বদলাবে না। বরং নিজের স্টাইল বজায় রাখলে একসময় বাকিরাও তোমাকেই অনুসরণ করবে।”
তবে বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে এসে থিয়েটারের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর মন চলে যায় জীবনের অন্তিম সত্যের দিকে। উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “একদিন সবাইকেই চলে যেতে হবে। আমি জানি না, আগামীকাল আমিও এই দুনিয়ায় থাকব কি না। সবার জীবনই একসময় সেই চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছোয়। আমারও পৌঁছোবে।”
সেদিন জীবন ও মৃত্যুর হিসাব মেলানোর সেই কথাগুলোর গভীরে ছিল এক আত্মোপলব্ধি। তিনি আরও প্রশ্ন রেখেছিলেন, “তার আগে আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, তা করতে পেরেছি কি? আমার দুনিয়া যদি শুধু নিজের পরিবার আর চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমি এই পৃথিবীতে এলাম কেন? সমাজ বা দেশের জন্যও তো আমাদের কিছু ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
কে জানত, মৃত্যুর ঠিক চার দিন আগে করা নানা পটেকরের এই দার্শনিক কথাই এত দ্রুত সত্যি হয়ে ধরা দেবে! তাঁর সেই শেষ বার্তা আর জীবনদর্শন ভক্ত ও নাট্যপ্রেমীদের মনে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।