ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা এখন আর শুধু লিচু উৎপাদনের জন্য পরিচিত নয়; লিচুর মৌসুমে এটি পরিণত হয়েছে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের এক প্রাণচঞ্চল কেন্দ্রবিন্দুতে। সুস্বাদু ও রসালো লিচু, লাল মাটির টিলা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছে এ জনপদে।
উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, চম্পকনগর ও সিংগারবিল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা লিচুবাগানগুলো এখন দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লালচে লিচু যেন প্রকৃতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই বাগানে ঘুরতে আসছে, ছবি তুলছে এবং গাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা লিচু কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাগানমালিকরা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পাইকার, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ বিজয়নগরে আসছে। এতে একদিকে যেমন লিচুর বিক্রি বেড়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উপজেলার আউলিয়া বাজারসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লিচু বেচাকেনা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বিজয়নগরে ৬৪০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৫ হেক্টর জমিতে ফলন এসেছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২৯ কোটি টাকা। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যার কারণে এ বছর উপজেলায় লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে।
এ অঞ্চলে উৎপাদিত লিচুর জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বোম্বাই, পাটনাই, চায়না-২ ও চায়না-৩। স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় এবং সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত হওয়ায় এসব লিচুর চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক।
দর্শনার্থীদের অনেকেই জানায়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর পাশাপাশি সরাসরি বাগান থেকে তাজা লিচু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক। ফলে লিচুবাগানগুলো এখন শুধু কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং মৌসুমি পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
তবে বাম্পার ফলনের মাঝেও কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে চাষিদের মধ্যে। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টির কারণে অনেক বাগানে লিচু ফেটে যাওয়া ও পচন ধরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ওঠানো এবং প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে তারা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব অব্যাহত থাকলে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন অনেক চাষি।
স্থানীয়দের মতে, কয়েক বছর আগেও বিজয়নগর মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু লিচু চাষের সম্প্রসারণ এবং এর সঙ্গে পর্যটকদের আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে এখানে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এখন এ সময়টিকে ‘লিচু উৎসবের মৌসুম’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারমূল্য সন্তোষজনক থাকলে এ মৌসুমে চাষিরা বাম্পার ফলনের পূর্ণ সুফল ঘরে তুলতে পারবে। ‘ফলের রাজ্য’ খ্যাত বিজয়নগর ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে।