দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নিজের অপরিহার্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছিলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
যৌবনের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে কাটানোর পর মার্কিন বাচনভঙ্গিতে কথা বলতে পারদর্শী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি সম্পর্কে তার অনন্য বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়ে অসংখ্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মুগ্ধ ও প্রভাবিত করেছেন, যাতে তারা ইসরায়েল এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রকল্পগুলোর প্রতি অবিচল সমর্থন বজায় রাখেন। একসময় মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ে ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুর প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল। বিশেষ করে, যখন ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি যৌথ যুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রাজি হওয়া প্রথম মার্কিন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
তবে সেই যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়ার কারণে, ইসরায়েলি পরামর্শ ছাড়াই ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তি করতে তুলনামূলক বেশি আগ্রহ প্রকাশ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার কারণে বর্তমানে ইসরায়েলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নেতানিয়াহুর ‘ট্রাম্প কার্ড’ হয়তো আর আগের মতো প্রয়োজনীয় নাও হতে পারে।
তাই বলা যায়, নেতানিয়াহুর জন্য বর্তমান সময়টি অত্যন্ত খারাপ সময়ে পরিণত হয়েছে। কারণ, আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে তিনি দেশে নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার এবং মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত সংঘাত চলমান থাকায় তিনি বেশ কোণঠাসা হয়ে আছেন।
তাই ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফর একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কেননা ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি তার প্রথম সফর। এর মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলি জনগণকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য একটি বাড়তি সুযোগ পাচ্ছেন।
বাহ্যিক সমীকরণ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, এই অভিযানের সম্ভাব্যতা এবং ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর সুযোগের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে মূলত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীই রাজি করিয়েছিলেন।
এছাড়া, ইসরায়েলের দিন দিন সহিংস হয়ে ওঠা বসতি স্থাপনকারী আন্দোলনের প্রতি নেতানিয়াহুর স্পষ্ট প্রশ্রয়ের বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসে উদ্বেগ বেড়েছে। এর মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের হাতে একজন মার্কিন সিনেটরকে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক করার ঘটনাও ঘটেছে। পাশাপাশি ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিমান বিক্রির বিষয়টি বিবেচনা করা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে ওয়াশিংটনের সম্মত হওয়া নিয়েও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
নিউ ইয়র্কে ইসরায়েলের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালান পিঙ্কাস বলেন, ‘নেতানিয়াহুর এই সফরের আসল কারণটি পুরোটাই রাজনৈতিক স্বার্থপরতা। নেতানিয়াহু দাবি করছেন যে, তিনি তাঁর খুব ভালো বন্ধু প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন।’
পিঙ্কাস আরও বলেন, ‘দৃশ্যত একটি এজেন্ডা রয়েছে, বলা হচ্ছে তারা ইরান, এফ-৩৫ এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু সত্যি বলতে দুটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এটি বলা হচ্ছে আর তা হলো- প্রথমত, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে তার মিত্র ও সমালোকদের এটি নিশ্চিত করা যে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে এবং দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প যাতে দুর্নীতি মামলায় আবারও ক্ষমার আহ্বান জানান সেই আশা করা।’ উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পক্ষে ইসরায়েলে এক নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ করেছিলেন।
তবে নেতানিয়াহু হয়তো আশা করছেন ট্রাম্পের সঙ্গে সফল বৈঠকের বিষয়টি জনমত জরিপে তাকে সাহায্য করবে, কিন্তু তিনি এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাচ্ছেন যখন সেখানে তার গ্রহণযোগ্যতা সম্ভবত সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থিদের প্রতিনিধি বিশেষ করে পডকাস্ট হোস্ট টাকার কার্লসন এবং প্রাক্তন রিপাবলিকান প্রতিনিধি মার্জোরি টেলর গ্রিনের মতো ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে নেতানিয়াহু ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ‘কিছু’ ইসরায়েলির সমালোচনা করেছেন। মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য তিনি ইরানের সঙ্গে যে চুক্তিতে মধ্যস্থতা করছিলেন, ইসরায়েলি সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তি তা বানচাল করার চেষ্টা করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই বৈঠকে প্রকাশ্যে প্রশংসা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষে আড়ালে থাকবে রাজনৈতিক চতুরতা। সোমবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য বিরোধিতা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কী বিক্রি করা উচিত তা কেউ আমাকে বলে দিতে পারে না।’
এ প্রসঙ্গে কিংস কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক আহরোন ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন যখন ট্রাম্পের আশপাশের অনেকেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিষাক্ত হয়ে উঠেছেন। সত্য বা মিথ্যা যা-ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রে তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয় যিনি ট্রাম্পকে এমন একটি ইচ্ছাকৃত যুদ্ধে টেনে এনেছেন যা শেষ পর্যন্ত একটি কৌশলগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। কেউ, এমনকি ট্রাম্পও তাকে এখন নিজেকে কক্ষের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হিসেবে জাহির করতে দেবেন না। সেই দিন চলে গেছে।’
যদিও সফর থেকে প্রকাশ্যে অসন্তোষের কোনো চিহ্ন পাওয়া যাবে না বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিচালনার একচ্ছত্র যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার নেতানিয়াহুর যে ক্ষমতা—তা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
নব্বইয়ের দশকে নেতানিয়াহুর সহকারী হিসেবে কাজ করা ইসরায়েলি পোলস্টার মিচেল বারাক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেতানিয়াহুর অসাধারণ ট্র্যাক রেকর্ড ছিল, কিন্তু তিনি অনেক সেতু পুড়িয়ে ফেলেছেন।’ তিনি আরও জানান, নেতানিয়াহুর সমালোচনা শুধু রিপাবলিকান পার্টির জাতীয়তাবাদী অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এতে পার্টির মধ্য-ডানপন্থী ঐতিহ্যবাহী মিত্ররাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মিচেল বারাক বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং ইরান যুদ্ধের শুরুতে নেতানিয়াহুর প্রতি মার্কিন সমালোচনায় চাপ স্পষ্ট দেখেছি। তাই ট্রাম্প নেতানিয়াহুর পক্ষে আর কতদিন প্রচার চালাবেন তা নিয়ে আমি নিশ্চিত নই। খুব সহজেই এমনটা হতে পারে যে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে একজন দুর্দান্ত যুদ্ধকালীন নেতা ঘোষণা করে বলবেন, এবার ইসরায়েলের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে; এরপর তিনি অন্যান্য ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাউকে সমর্থন দেবেন।’