জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদের আরেক দোসরের পতন হলো : মাহমুদুর রহমান

বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবী ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, জুলাই শুধু একটি মাস নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহান অধ্যায়। কাকতালীয়ভাবে এই জুলাই মাসেই ফ্যাসিবাদের আরেক দোসরের (সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন) পতন ঘটেছে। আজ বঙ্গভবন খালি হয়েছে। ২৪ জুলাই, ৩৬ জুলাই এখনও শেষ হয়নি। জুলাই বিপ্লব চলমান।

আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে মুফাচ্ছির আহমদ ফয়েজীর একক ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মাহমুদুর রহমান।

মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, এই জুলাই মাসেই আমাদের ফ্যাসিবাদের মনিবের প্রভু নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও ভারতে আন্দোলন চলছে। তাই জুলাই একটি মহান মাস। আমরা এই জুলাইকে ভুলব না, ভুলতে দেবও না, ইনশাল্লাহ।

মাহমুদুর রহমান বলেন, আমাদের অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে। প্রবীণদের হয়েছে, তরুণদেরও হয়েছে। কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বিপ্লব শেষ হয়নি, এটি এখনও চলমান। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে, কিন্তু দুই বছরও পূর্ণ হয়নি। আগামী ৫ আগস্ট দুই বছর হবে। আমরা যদি প্রতিনিয়ত জুলাই বিপ্লব নিয়ে চর্চা করি, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা এবং জুলাই বিপ্লব আরও সংহত হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মাহমুদুর রহমান বলেন, এই আয়োজনের প্রধান অতিথি হিসেবে নিজেকে আমি খুব উপযুক্ত মনে করি না। কারণ আমি চিত্রকলার বোদ্ধা না। তিনি বলেন, আমি কিছু লেখালেখি করি, সেটাও খুব দুর্বল সাহিত্যচর্চা। তবে ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আমার গভীর অনুরাগ রয়েছে। আমার মা বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন, সম্ভবত সে কারণেই সাহিত্যের প্রতি আমার এই ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, মুফাচ্ছির আহমদ ফয়েজীর এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি তার শিল্পকর্মের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ১৭৫৭ সালে স্বাধীনতা হারানো থেকে শুরু করে জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন।

মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ফ্যাসিবাদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণরা কালি-কলম দিয়ে লড়াই করেছে। জুলাইয়ের গ্রাফিতি ও স্লোগান আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ কিংবা ‘দেশটা কারও বাপের না’—এমন স্লোগানগুলো আন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

মাহমুদুর রহমান বলেন, যারা এসব স্লোগান সৃষ্টি করেছেন, তারা দেশের সন্তান। তারা কালি-কলম দিয়ে যেমন লড়েছেন, তেমনি অস্ত্রের মুখেও দাঁড়িয়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই দেশ নতুন করে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছে। তিনি বলেন, যারা শহীদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন— সব জুলাই যোদ্ধার প্রতি আমার স্যালুট।

মাহমুদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে জুলাই বিপ্লবকে ভুলিয়ে দেওয়া, বিতর্কিত করা এবং হেয় করার ষড়যন্ত্র করছে। তার ভাষায়, যারা এই কাজ করছে, তারা ফ্যাসিবাদের দোসর এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের এদেশীয় এজেন্ট।

মাহমুদুর রহমান বলেন, এই ষড়যন্ত্র সফল হবে না। কারণ মুফাচ্ছির আহমদ ফয়েজীর মতো শিল্পীরা তাদের রং-তুলি দিয়ে জুলাই বিপ্লবের বীরত্বগাথা তুলে ধরছেন। কবিতা শুধু শব্দ দিয়ে লেখা হয় না, তুলির আঁচড়েও কবিতা রচিত হয়। তাদের শিল্পকর্মই জুলাই বিপ্লবের কাব্য।

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে মাহমুদুর রহমান একটি শিশুর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় ইস্তাম্বুলে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ইউটিউবে তিনি দেখেছিলেন, প্রায় সাত বছর বয়সী এক শিশু মায়ের সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় আন্দোলনে নেমেছে। সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন সে আন্দোলনে এসেছে। শিশুটি জবাব দিয়েছিল, ওরা আমার ভাইকে খুন করেছে। এরপর যখন জানতে চাওয়া হয় তার ভাই কে, তখন সে বলেছিল, আবু সাঈদ আমার ভাই। এই কথা বলেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং মাকে জড়িয়ে ধরে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, এটাই জুলাই বিপ্লবের চেতনা। তিনি বলেন, এসব গল্প বারবার বলতে হবে। বক্তৃতায়, সাহিত্যে, নাটক-সিনেমায়, চিত্রকলায়—সব মাধ্যমে জুলাইয়ের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।

শহীদ আনাসের কথা স্মরণ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস বয়সী আনাস আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাবার উদ্দেশে চিঠি লিখে জানিয়েছিল, আজ সবাই যখন লড়াই করছে, আমি স্বার্থপরের মতো বাড়িতে থাকতে পারলাম না। যদি ফিরে না আসি, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। এরপর সে আর ঘরে ফেরেনি।

একই সঙ্গে মাহমুদুর রহমান ইয়ামীন ও নাফিসের ঘটনাও তুলে ধরেন। তার অভিযোগ, ইয়ামীনকে আহত অবস্থায় পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং নাফিস গুলিবিদ্ধ হয়ে রিকশার পাদানিতে রক্তক্ষরণে মারা যান। তিনি দাবি করেন, একাধিক হাসপাতালে নিয়েও তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা একজন মৃত্যুপথযাত্রী তরুণকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তারা কারা—সেটা জানতে ইচ্ছা করে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের শহীদরা নতুন করে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন। তাই তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জাতির দায়িত্ব। তাহলেই জুলাই বিপ্লবকে ভুলিয়ে দেওয়ার সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।

বক্তব্যের শেষে মুফাচ্ছির আহমদ ফয়েজীকে এমন একটি প্রদর্শনীর আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ জানান মাহমুদুর রহমান। একই সঙ্গে আয়োজকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জুলাইয়ের সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও সালাম জানিয়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বক্তব্য শেষ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *