গুম খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিচারের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি বিচারকাজে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আজ মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) বিচারপতি গোলাম মুর্তজা মজুমদারের নেতৃত্বে বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, এ পর্যন্ত প্রত্যেক দিনই জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত আনা হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর তার জীবননাশের আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে একটি আবেদন করেন আইনজীবী নাজনীন নাহার। নিরাপত্তার কারণে প্রিজনভ্যানে অন্য আসামিদের সঙ্গে তিনি আসতে চান বলে জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছি যে, জীবননাশের আশঙ্কা, নিরাপত্তার বিষয়ে আসামিপক্ষের সঙ্গে একমত। কিন্তু অপর আসামিদের সঙ্গে প্রিজনভ্যানে আনা-নেওয়ার আবেদনের ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছি। কেননা সব আসামির ক্ষেত্রেই এই অনিরাপত্তার বিষয়টি প্রযোজ্য হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১২ অক্টোবর) জেলখানা থেকেই মামলার কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন জিয়াউল। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামকে আজ জেরা করবে আসামিপক্ষ।
এমএইচ তামিম বলেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কারণে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে না এনে জেলখানায় রেখে ভার্চুয়ালি হাজিরা দেওয়ার আবেদন করেছি। কারণ ট্রাইব্যুনালের এজলাসে অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের সব ব্যবস্থা রয়েছে। কারাগারেও একই ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। আজ থেকে জিয়াউল আহসানকে জেলখানায় রেখে ভার্চুয়ালি মামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আদালত। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।
গত ৮ অক্টোবর এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউলের বিরুদ্ধে রফিকুল ইসলামের জবানবন্দি শেষ হয়। তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখনই জনসম্মুখে আসতো, তখন ওই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য লোকদেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত করা হতো।
ট্রাইব্যুনালকে রফিকুল ইসলাম জানান, মূলত প্রকৃত অপরাধীরা যেন আড়ালে থেকে যান, সেজন্য নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবহার করা হতো। নিয়ন্ত্রিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের উদ্দেশ্যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করে কর্মকর্তাদের মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত এবং পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করা।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে জেরার জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আসামিপক্ষের জেরার মুখোমুখি হবেন রাষ্ট্রপক্ষের এই ১৫তম সাক্ষী।
প্রসিকিউশন জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর জবানবন্দি দেন কামরুল ইসলাম। একই দিন মামলার ১৩তম সাক্ষী র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা শেষ হয়। তিনি ছিলেন মামলার সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী।
এ মামলায় সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। প্রথমটি হলো- ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিন হত্যা।
দ্বিতীয় অভিযোগে অপরাধের সময়কাল হলো ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়টায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ হত্যার অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। অর্থাৎ দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লিখিত সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ ৫০ জনের প্রাণ নেওয়া হয়।
এসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। একই দিন ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।