জার্মানির বাভারিয়ায় হিটলারের ‘ঈগলস নেস্টে’ ভয়াবহ আগুন, সন্দেহভাজন আটক

জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যে নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের ঐতিহাসিক পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র ‘ঈগলস নেস্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ এ তথ্য জানায়। 

তবে আগুন লাগার কারণ এবং এর সঙ্গে আটক ব্যক্তির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর), স্থানীয় সময় রাত ৯টা ১৫ মিনিটে, ট্রাউনস্টাইনের জরুরি সেবাকেন্দ্রে ভবনটিতে আগুন লাগার খবর পৌঁছায়। পরে দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভবনটিকে আগুনে পুরোপুরি ঘেরা অবস্থায় দেখতে পান।

পুলিশ জানিয়েছে, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে আগুন নেভানোর কাজে বাধার মুখে পড়ছেন উদ্ধারকর্মীরা। শনিবার স্থানীয় সময় ভোরেও আগুন জ্বলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২শ’ জন জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

‘ঈগলস নেস্ট’ নামে পরিচিত স্থাপনাটির আনুষ্ঠানিক নাম কেলস্টাইনহাউস। জার্মানির বের্শটেসগাডেন শহরের ওপরে আল্পস পর্বতমালার একটি পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত ভবনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যবহৃত একাধিক স্থাপনার একটি ছিল।

১৯৩৮ সালে, নাৎসিদের নির্মিত, ‘ঈগলস নেস্ট’ হিটলারের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আশপাশের এলাকাটি নাৎসি নেতৃত্বের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

‘ঈগলস নেস্টে’র কাছেই ছিল হিটলারের বাসভবন বার্গহফ। ১৯৪১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের পরিকল্পনা প্রণয়নে হিটলার ও নাৎসি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই বাসভবন ব্যবহার করেছিলেন। পুরো এলাকাটিকেই হিটলারের অন্যতম সদর দফতর হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

এলাকাটিকে প্রচারণামূলক চলচ্চিত্রের পটভূমি হিসেবেও ব্যবহার করেছিল নাৎসিরা। এসব চলচ্চিত্রে হিটলারকে পশুপাখি ও প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো।

১৯৪৫ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, নাৎসিদের পরাজয়ের পরও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় ‘ঈগলস নেস্ট’। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ভবনটিতে একটি পাহাড়ি সরাইখানাও রয়েছে।

স্থাপনাটির সরকারি ওয়েবসাইটে একে ‘অমানবিক নাৎসি একনায়কতন্ত্রের ভয়াবহতার একটি সতর্কতামূলক স্মারক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও তার অনুসারীদের কর্মকাণ্ডে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ইউরোপের বিপুলসংখ্যক ইহুদি ছিলেন, যাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া সমকামী, রোমা জনগোষ্ঠীর মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘুকে বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন স্থানে হিটলারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করা হবে, অন্য কাজে ব্যবহার করা হবে, নাকি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

এক পক্ষের মতে, ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ভবনগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, এসব স্থাপনা নব্য-নাৎসি ও উগ্র ডানপন্থিদের কাছে স্মৃতিসৌধ কিংবা কথিত তীর্থস্থানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা।

গত জুনে, বার্লিন কর্তৃপক্ষ হিটলারের ব্যবহৃত একটি বাঙ্কার ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার কথা জানায়। সে সময় স্থাপনাটিকে ‘নাৎসি জার্মানির ক্ষমতার কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। সেখানে আবাসিক ফ্ল্যাট ও কার্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এ পরিকল্পনার সমালোচকেরা বলেছেন, বাঙ্কারটির উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তাদের মতে, এটি ভেঙে না ফেলে যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে প্রদর্শনীসহ একটি জাদুঘর ও স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করা উচিত ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *