জলবায়ু পরিবর্তনে উষ্ণ হচ্ছে হিমালয়, বাড়ছে নেপালের মতো দুর্যোগ

সম্প্রতি নেপালের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের দিকে পানি, পাথর ও কাদার স্রোত ধেয়ে এলে পেমা তামাং ও তার প্রতিবেশীরা পাহাড়ের উপরের দিকে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে আশ্রয় নেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর গত বছরই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।

ইতোমধ্যে ভূমিকম্পপ্রবণ হিমালয়ের খাড়া পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে উঁচু পর্বতের হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে ওই অঞ্চলে ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা হচ্ছে। এতে নদীর গতিপথ কখনো কখনো ভয়াবহ দ্রুততায় বদলে যাচ্ছে। এক দুর্যোগের পর আরেক দুর্যোগের মধ্যে বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের জন্য খুব কম সময়ই মিলছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়তে থাকায় এসব জনগোষ্ঠী টিকে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মন্দিরটির কথা উল্লেখ করে তামাং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘ভূমিকম্পে মন্দিরটি ধ্বংস হওয়ার পর মাত্র গত বছরই আমরা এটি পুনর্নির্মাণ করেছি। বন্যার কবল থেকে প্রাণ বাঁচাতে আমরা সেখানেই আশ্রয় নিই।’ কাঠমান্ডুর একটি বৌদ্ধবিহারে তৈরি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসে তিনি এসব বলছিলেন।

নেপাল ও প্রতিবেশী চীনে ২৬ আগস্টের বন্যায় ১ হাজার ২০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে শত শত মানুষ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হিমালয়ের একাধিক নদীতে শিলাস্তর ও হিমবাহের বরফ ধসে পড়ার পর ধ্বংসাবশেষ ও পানি প্রবল বেগে নেমে এলে এই বন্যার সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিপর্যয়ের সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি যোগসূত্র স্থাপনের জন্য এখনই উপযুক্ত সময় নয়। তবে তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়ানোর কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে এ ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কাও বাড়ছে, বিশেষ করে হিমালয় পর্বতমালায়, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের তুলনায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত বাড়ছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলা ও স্থিতিস্থাপকতা বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, ‘হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। এর ফলে এ ধরনের জটিল দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে যা নিম্নাঞ্চলের জনগোষ্ঠী ও বিনিয়োগে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।’

হিমালয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব আরও তীব্র

সান্যাল বলেন, এই অঞ্চল ক্রমেই এমন সব বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে যেগুলো একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলছে।

তাপমাত্রা বাড়ার ফলে উঁচু পর্বতের বরফ গলে যাচ্ছে। এর ফলে শিলাধস, তুষারধস ও বন্যা আরও ঘন ঘন হচ্ছে। তুষারধস কোনো নদীর গতিপথ আটকে দিতে পারে, পরে সেই বাধা ভেঙে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। প্রাথমিক কোনো দুর্যোগের পর ভারি বৃষ্টি ধ্বংসযজ্ঞ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গত বছর নেপালের একই অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় নয় প্রাণহানি এবং লাখ লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলে ২০১৩ সালের কেদারনাথের বন্যা, ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয়, ২০২৩ সালের দক্ষিণ লোনাক হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক পানি নেমে আসার ফলে বন্যা এবং সাম্প্রতিক অন্যান্য ভূমিধস ও বন্যায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শত শত বিলিয়ন ডলারের।

সান্যাল বলেন, নেপালের মানুষ গত বছরের বন্যার ক্ষতি থেকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠে মানিয়ে নেওয়ার আগেই আরেকটি দুর্যোগ এসে পড়ল।

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলটি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত। মেরু অঞ্চলগুলোর বাইরে সবচেয়ে বেশি বরফের ঘনত্ব রয়েছে এই অঞ্চলে। এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীব্যবস্থার ওপর প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে।

সান্যালের আন্তঃসরকারি জলবায়ু গবেষণা দলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আরেকটি ঝুঁকি হলো পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘ সময় ধরে জমাট অবস্থায় থাকা মাটি গলে যাওয়া। এতে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

গত সপ্তাহে হিমবাহ ধসে পড়ার স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ শিলাস্তর ও হিমবাহের বরফ নিচের উপত্যকায় ধসে পড়েছে। এতে কয়েকতলা ভবনের সমান উঁচু পানি ও কাদার দেয়াল তৈরি হয়ে বহু কিলোমিটার দূরের জনপদগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।

পাহাড়ে অভিযোজনেরও সীমা রয়েছে

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু কিছু এলাকায় বিপদ এতটাই বাড়তে পারে যে সেখানে পুনর্নির্মাণ আর বাস্তবসম্মত হবে না। ফলে বাসিন্দাদের অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ওই অঞ্চলে সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে।

নেপালের জলবায়ু নীতি বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক আলোচক মনজিৎ ধাকাল বলেন, ‘কিছু এলাকায় অভিযোজন বা মানিয়ে নেওয়ার সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রম হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ভূমিকম্পে কোনো বাড়ি ধ্বংস হলে অনেক সময় সেখান থেকে জিনিসপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু ভয়াবহ বন্যা শুধু বাড়িই ধ্বংস করে না, এর নিচের জমিও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক, পানির ব্যবস্থা, স্কুল ও বিদ্যুৎব্যবস্থাও ধ্বংস হতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতে মানুষকে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।

জমি ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদনের আগে আরও ভালো ঝুঁকি মূল্যায়ন, সীমান্তের দুই পাশে উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

তবে সান্যালের মতে, ২৬ আগস্টের বন্যার বিষয়ে ৬ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও তাদের কেউ কেউ ছিলেন পর্যটক বা অভিবাসী শ্রমিক, যারা নেপালি ভাষা বুঝতে পারেননি। আবার কেউ কেউ এই ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেননি। নদীর পানি পরিমাপের জন্য স্থাপিত কিছু ব্যবস্থাও পানির প্রবল স্রোতে অচল বা ভেসে গেছে।

নেপালের নুয়াকোটের ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা চান্দা লাল চিত্রকার এপিকে বলেন, সতর্কবার্তায় তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। তবে পানি বাড়তে শুরু করলে প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাহাড়ের দিকে দৌড় দেন।

ধনী দেশগুলোর বিপুল কার্বন নিঃসরণের খেসারত দিচ্ছে নেপাল

সান্যাল বলেন, কী পদক্ষেপ নিতে হবে, সতর্কবার্তায় শুধু বিপদের কথা জানানো নয়, কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে সে বিষয়েও আরও তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া, একাধিক ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় অবকাঠামো মূল্যায়ন করা এবং দুর্যোগ পরিকল্পনায় স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

জলবায়ুবিষয়ক আলোচক ধাকাল উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর কিছু মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য যারা দায়ী, যারা এত দীর্ঘ সময় ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে লাভবান হয়েছে, আমাদের তাদের দায়ী করা উচিত। কার্বন নিঃসরণ জরুরিভিত্তিতে কমানোর অনুপ্রেরণা হিসেবে আমরা অন্তত এই ভয়াবহ উদাহরণটিকে কাজে লাগাতে পারি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *