বোস্টনে শুরুটা হয়েছিল কিলিয়ান এমবাপের জন্য হতাশা দিয়ে। প্রথমার্ধে মরক্কোর রক্ষণভাগ ভাঙতে গিয়ে বারবার আটকে যান গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর কাছে। ২৮ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টিও কাজে লাগাতে পারেননি ফরাসি অধিনায়ক। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফ্রান্সের হাতে থাকলেও এমবাপের জন্য যেন কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছিল না। কিন্তু বড় তারকারা নিজেদের আলাদা করে চেনান কঠিন মুহূর্তে ফিরে এসে। দ্বিতীয়ার্ধে সেই পরিচিত রূপেই জ্বলে ওঠেন এমবাপে। একটি গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে অ্যাসিস্ট করে ফ্রান্সকে ২-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। আর নিশ্চিত করেন সেমিফাইনালের টিকিট!
৬০ মিনিটে দেজিরে দুয়ের পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশে ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন এমবাপে। এরপর মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে আবারও তার পায়ের ছোঁয়ায় আসে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোল। ৬৬ মিনিটে এমবাপের নিখুঁত পাস থেকে গোল করেন উসমান দেম্বেলে। দুটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখে ম্যাচের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার ছিলেন ফরাসি অধিনায়ক!
এই পারফরম্যান্সে চলতি বিশ্বকাপে এমবাপের গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮-এ। সমান ৮ গোল রয়েছে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিরও। তবে অ্যাসিস্টের বিচারে এগিয়ে আছেন এমবাপে। তার অ্যাসিস্ট এখন ৩টি, যেখানে মেসির রয়েছে মাত্র ১টি। সেই কারণেই গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আপাতত সবার ওপরে অবস্থান করছেন ফরাসি ফরোয়ার্ড।
মরক্কোর বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যাও ২০-এ উন্নীত করেছেন এমবাপে। একই সঙ্গে এবারের বিশ্বকাপে তার সরাসরি অবদান এখন ১১ গোলে-৮ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট। ১৯৭০ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে অন্তত ১১টি গোলে সরাসরি অবদান রাখার কীর্তি গড়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০০ গোলে সরাসরি অবদান রাখার মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন এমবাপে।
এমবাপের অ্যাসিস্টে গোল করে উসমান দেম্বেলের গোলসংখ্যাও দাঁড়িয়েছে ৫-এ। ফলে ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রোনালদো (৮) ও রিভালদোর (৫) পর প্রথমবারের মতো একই বিশ্বকাপে একই দলের দুই খেলোয়াড় অন্তত পাঁচটি করে গোল করার কীর্তি গড়লেন এমবাপে (৮) ও দেম্বেলে (৫)। ফ্রান্সের আক্রমণভাগে এই জুটির ধারাবাহিকতা দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে!
তবে দুর্দান্ত রাতের মাঝেও একসময় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্স শিবিরে। ৭৭ মিনিটে এমবাপে মাঠে বসে পড়লে চোটের আশঙ্কা তৈরি হয়। পরে তাঁকে তুলে নামানো হয় জঁ-ফিলিপ মাতেতাকে। যদিও ম্যাচ শেষে শঙ্কা দূর করেছেন এমবাপে নিজেই। তিনি বলেন, ‘পুরোপুরি সুস্থ আমি। গোড়ালিতে একটু আঘাত পেয়েছিলাম। তবে এখন সব ঠিক আছে। জেপি (জঁ-ফিলিপ মাতেতা) শেষ ১৫ মিনিটে আমার চেয়ে বেশি ভালো অবস্থায় ছিল।’
ম্যাচটি ছিল আরেকটি বিশেষ লড়াইও। ২০২৪ সালে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এমবাপে। অন্যদিকে ২০২১ সাল থেকে পিএসজিতে খেলছেন মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি। এক সময়ের দুই সতীর্থ এবার মুখোমুখি হয়েছিলেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত হাসি ফুটেছে এমবাপের মুখেই, তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিদায়ে তার অনুভূতিও ছিল স্পষ্ট।
ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো আবেগের স্থান নেই। এখানে কোনো অনুভূতি নেই। এখানে জিততে এসেছি। আর হাকিমিও জিততে এসেছিল। তবে এটা সত্য যে ম্যাচের পর যখন আমি ড্রেসিংরুমে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করব, তখন সেটা আমাকে স্পর্শ করবে। কারণ, সে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।’
ম্যাচ শেষে এমবাপেকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশমও। তার চোখে এমবাপে এমন একজন নেতা, যিনি সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন। কোচ বলেন, ‘ম্যাচটি কঠিন ছিল। পেনাল্টি মিস করেছি। অনেক সুযোগও কাজে লাগাতে পারিনি। কিন্তু যখন কিলিয়ান আছে, তখন কোনো সমস্যা হয় না। এমনকি আগে একটি সুযোগ নষ্ট করার পরও সে দ্বিধায় ভোগে না। অনেকে বলেন কিলিয়ান স্বার্থপর। সে শুধু নিজের কথাই ভাবে। কিন্তু সে দলের অধিনায়ক এবং একজন আদর্শ নেতা।’
দেশমের সেই আস্থার প্রতিদান দিচ্ছেন এমবাপে পারফরম্যান্স দিয়েই। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শীর্ষে থাকা এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে উসমান দেম্বেলের জুটিও হয়ে উঠেছে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেম্বেলের ঝুলিতে রয়েছে ৫ গোল, যার মধ্যে একটি হ্যাটট্রিকও আছে। ফ্রান্সের মোট ১৬ গোলের ১১টিই এসেছে এমবাপে ও দেম্বেলের পা থেকে। ক্লাব ফুটবলের দুর্দান্ত ফর্ম বিশ্বকাপের মঞ্চেও ধরে রেখে ফ্রান্সকে টানা শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই দুই তারকা।
এই এমবাপে আসলে কোথায় থামবেন?
এসএন/পিডিকে