এমপিও বহাল রাখতে অনিয়মের অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে

পটুয়াখালীর বাউফলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিও সুবিধা বহাল রাখতে অন্য বিদ্যালয়ের নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে উপজেলার দাশপাড়া ইউনিয়নের চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এ অনিয়মের ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, মফস্বল এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অন্তত ৩৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিতে হবে এবং পাসের হার থাকতে হবে ন্যূনতম ৫৫ শতাংশ। কিন্তু কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থী সংকট ও দুর্বল ফলাফলের কারণে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এসব শর্ত পূরণ করতে পারছে না।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ২২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করে ১০ জন। পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২১ জন, পাস করে ৮ জন। পাসের হার ছিল ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ। আর ২০২৫ সালে ২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান নিম্নমুখী। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থী কমে গেছে। এতে এমপিও সুবিধা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। চলতি বছরও বিদ্যালয়ে নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরীক্ষার্থী না থাকায় অন্য বিদ্যালয়ের নির্বাচনি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের এনে ফরম পূরণ করানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পূর্ব কালাইয়া হাসান সিদ্দিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ১৫ জন শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করানো হয়। যদিও শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ নেই।

অভিযোগ রয়েছে, মানবিক বিভাগের ফরম পূরণের সরকারি নির্ধারিত ফি ২ হাজার ৩১৫ টাকা এবং প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন ফি ৭০০ টাকা হলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রবেশপত্র দেওয়ার নামেও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে।

পরীক্ষার্থী মো. নাইম হোসেন বলেন, আমিসহ অনেকেই টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছিলাম। পরে আমাদের চর আলগী বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করতে বলা হয়। আমরা ১৬ জন ৮ হাজার টাকা করে দিয়ে ফরম পূরণ করেছি।

আরেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, যারা সাত বিষয়ে ফেল করেছে, তাদেরও ফরম পূরণ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের নিজেদের বিদ্যালয়ে সুযোগ না দিয়ে চর আলগী বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দুই প্রধান শিক্ষক আত্মীয় হওয়ায় যোগসাজশে এ কাজ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন বলেন, ফরম পূরণ ও মাইগ্রেশন ফি মিলিয়ে খরচ হওয়ার কথা প্রায় ৩ হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে প্রবেশপত্রের জন্যও টাকা চাওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্ব কালাইয়া হাসান সিদ্দিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কামাল আজাদ বলেন, চলতি বছরের নির্বাচনি পরীক্ষায় ৬৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ২০ জন সব বিষয়ে ফেল করায় তাদের ফরম পূরণ করা হয়নি। পরে ওই ২০ জনের মধ্যে ১৫ জন ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে।

শিক্ষার্থীদের চাপ প্রয়োগ করে অন্য বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করানো হয়েছে- এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল কামাল আজাদ বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি কাউকে চাপ দিইনি। শিক্ষার্থীরা আমাদের বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করতে না পেরে অন্য বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করেছে।

অন্যদিকে, জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করানো হয়েছে।

ফরম পূরণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আলাউদ্দিন বলেন, বোর্ডসহ বিভিন্ন খাতে খরচ দিতে হয়। সে কারণেই অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংকটের বিষয়ে আলাউদ্দিন বলেন, পাশাপাশি অনেক স্কুল ও মাদ্রাসা থাকায় আমাদের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম আসে। তবে নির্বাচনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কীভাবে নীতিমালা ভঙ্গ করে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে- এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

পটুয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. মুজিবুর রহমান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *