১৭ বছর ধরে তালাবদ্ধ কেশবপুর পাবলিক লাইব্রেরি

এক সময় যেখানে সকাল-সন্ধ্যা মুখর থাকত পাঠক, শিক্ষার্থী আর সংস্কৃতিপ্রেমীদের পদচারণায়; নিয়মিত ওল্টানো হতো দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী আর হাজারো বইয়ের পাতা—আজ সেখানে সুনসান নীরবতা। ভবনের দেয়ালে, দরজায় আর জানালায় এখন শুধুই আগাছা আর লতাপাতার ভিড়।

এটি হলো যশোরের কেশবপুর পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী ‘কেশবপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। এটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থেকে এখন যেন এক পরিত্যক্ত ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ১৯৮৩ সালে এলাকার বিশিষ্ট সাহিত্যিক বিমল দে, জহুরুল হক, এরশাদ আলী, মনি মোহর ধর ও আব্দুল করিমের যৌথ উদ্যোগে এবং ব্র্যাকের ‘কমিউনিটি সেফটি প্রকল্পে’র সহযোগিতায় এই লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং যশোর জেলা পরিষদের অর্থায়নে লাইব্রেরিটির জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল।

লাইব্রেরিটির বর্তমান এই পরিণতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাব। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৫ সালে তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খলিলুর রহমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা বিলুপ্ত করে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এরপর আর কোনো কমিটি হয়নি।

২০১৭ সালে লাইব্রেরিটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে এটি পরিচালনার চেষ্টা করায় সাধারণ মানুষ ও প্রকৃত পাঠকরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিমুখ হয়েছেন।

লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায় ফটকে ঝুলছে মরচেধরা তালা। ভবনের চারপাশ ও ছাদ লতাগুল্মে আচ্ছাদিত। জানালা ও দরজার কাঠ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। 

সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন বলেন, মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই কেশবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরিটি আজ বিলুপ্তির পথে। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে সব জটিলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে তার পূর্বরূপে ফিরিয়ে আনা হোক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন বলেন, লাইব্রেরিটি এই অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। দীর্ঘদিন এটি বন্ধ থাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের যে ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা অবগত আছি। অতীতে কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল।

ইউএনও আরও বলেন, আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে স্থানীয় সুধীজন, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও কার্যকর কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেব। ভবনটি পরিষ্কার ও সংস্কারকাজ এবং নতুন বই সংগ্রহের মাধ্যমে লাইব্রেরিটিকে আধুনিক রূপ দিয়ে আবারও পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *