১৬৫তম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী ঘিরে উৎসবমুখর পতিসর

২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে নওগাঁর পতিসরে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। চলছে রং-বার্নিশ, তোরণ, মঞ্চ প্যান্ডেল তৈরি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ।

এবারে কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী দিয়ে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে পতিসর কাচারীবাড়ি। এ জন্য এবারের রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উৎসবে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। দিনব্যাপী অনুষ্ঠেয় এবারের উৎসব হবে আড়ম্বরড়পূর্ণ—আশা আয়োজকদের।

নওগাঁ শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে আত্রাই উপজেলার নিঝুম-নিস্তব্ধ-নিভৃত পল্লী পতিসর। কবিগুরু রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর কালীগ্রাম পরগণার জমিদারি প্রাপ্ত হয়ে প্রথম পতিসরে আসেন ১৮৯১ সালে। এরপর থেকে কবি ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এই কাচারীবাড়িতে আসতেন। এখানে বসে রচনা করেছেন অনেক কবিতা গল্প, প্রবন্ধ। তাঁরই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবারে জাতীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিগ্রাম পরগনার কাচারীবাড়ি পতিসর হাজারো রবীন্দ্র ভক্তের উপস্থিতি যেন মিলনমেলায় রূপ নেবে। বসবে গ্রামীণমেলা। দূরদূরান্ত থেকে নারী-পুরুষরা আসবে এ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে।

পতিসরে রবীন্দ্র সংগ্রহশালার প্রতিষ্ঠাতা এম মতিউর রহমান মামুন  জানান,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিসরে এসে শুধু সাহিত্য রচনা করেননি। এর পাশাপাশি সমাজ সংস্কারেও তার অন্যন্য ভূমিকা রয়েছে। কবিগুরু তার নোবেল প্রাপ্তির অর্থ দিয়ে সহজ শর্তে তৎকালিন কৃষকদের ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য কবিগুরু সর্বপ্রথম কলের লাঙল দিয়ে হালচাষ শুরু করেছিলেন। কবিগুরুর অমূল্য সম্পদ, চিঠিসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল এখানে কবির স্মৃতিগুলো দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিয়াম করে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। এখনও রবীন্দ্র কাচারীবাড়িতে কোনো কাস্টডিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি ছিল।

এ ছাড়া, এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে পতিসরে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের। কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীতে এমন ঘোষণা আসবে এমনটাই আশা এখানকার রবীন্দ্র ভক্তদের।
কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবিব  জানান,  কবিগুরুর যে স্বপ্ন ছিল তা এ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। কবিগুরুর ছেলে রথীন্দ্রনাথের নামে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাটির অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন এখন পর্যন্ত হয়নি। এখনও জাতীয়করণ করা হয়নি। এই প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হলে এ এলাকার শিক্ষার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনাটা অনেক সুদুর প্রসারী ছিল। শিকড় থেকে শেখরে উঠার একটি অধ্যায়। কবিগুরুর স্মৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করতে গেলে এখানে কবির একটি আর্কাইভ করা দরকার। যা শুধু যুগ যুগ নয়, হাজার বছর ধরে কবিগুরুর স্মৃতি বহন করবে।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. মনিরুজ্জামান  জানান,  পতিসরের ঐতিহাসিক কাচারিবাড়ি প্রাঙ্গণে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এরপর দেবেন্দ্র মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। যেখানে কবিগুরুর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোকপাত করবেন দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিকরা। উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।  সেই লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে কবির কাচারিবাড়ি। ২৫ বৈশাখ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত পতিসর কুঠিবাড়ি। যেখানে দিনভর থাকবে দর্শনার্থীদের ভিড়।

এ ছাড়া, ২৫ বৈশাখের আয়োজন ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। গ্রামীণমেলার আয়োজন থাকবে এজন্য মানুষের উপস্থিতি হবে অনেক। পাশাপাশি আলোচনা সভায় এলজিআরডিমন্ত্রী, ভুমিমন্ত্রী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, কবি সাহিত্যিক, রবীন্দ্র গবেষকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান জাতীয়ভাবে উদযাপন করার জন্য পতিসরে আয়োজন চলছে। ২৫ বৈশাখকে ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার পতিসর পরিদর্শন করেছে পুলিশের একাধিক টিম। অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে পুলিশ, ডিবিসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর দিনব্যাপি অনুষ্ঠান উপলক্ষে পতিসর ও আশপাশের এলাকাজুড়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা। পোশাকী পুলিশের পাশাপাশি থাকবে সাদা পোশাকের নিরাপত্তা বলয়। আশা করি সবাই মিলে অনুষ্ঠান সফলভাবে শেষ করা যাবে।

আত্রাই-রাণীনগর আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম  জানান,  ২৫ বৈশাখ কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। এখানে কবিগুরুর জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান মনোমুগ্ধকর করতে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মী, আত্রাই-রানীনগর দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনের টিম  কাজ করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন ও আলোচনা করবেন। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মএমপিসহ জাতীয় নেতা, কবি সাহিত্যিক, রবীন্দ্র গবেষকসহ প্রশাসনেরঊউর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আমরা মনে করি দীর্ঘদিন পর স্মরণকালের বৃহত্তম একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা আশা করি, ২৫ বৈশাখ পতিসরে স্মরণকালের সেরা আয়োজন হবে—সবার সহযোগিতায় সেভাবেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *