মরুর বুকে কাতার বিশ্বকাপে পর্তুগালকে কাঁদিয়ে শেষ ১৬-র টিকিট কেটেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। এশিয়ার সেই পরাশক্তি এবার পা রাখছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে। ১৯৮৬ সাল থেকে টানা ১১ বার বিশ্বকাপ খেলা এই দলটি কেবলই একটি দল নয়, বরং ফুটবলের মানচিত্রে এক অপ্রতিরোধ্য এশিয়ান প্রাচীর।
ঘরের মাঠে ২০০২ সালের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে খেলার সোনালী স্মৃতি আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার তেজ বুকে নিয়ে এবার মাঠে নামছে ‘টেইগুক ওয়ারিয়র্স’রা। দলের প্রাণভ্রোমরা ও মহাতারকা সন হিউংমিনের কাঁধে ভর করে এবং বায়ার্ন মিউনিখের ডিফেন্স-প্রাচীর কিম মিনজের ইস্পাতকঠিন সুরক্ষায় এশিয়ান জায়ান্টরা এবার প্রস্তুত ইতিহাসের পূনরাবৃত্তি ঘটাতে।
ডাগআউটের ফিরেছেন ঘরের ছেলে হং মিউংবো
দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি হং মিউংবো ১০ বছর পর ঘরের ছেলে আবারও ঘরে ফিরেছেন। টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের পদ ছেড়ে এবার বসেছেন প্রধান কোচের হটসিটে। খেলোয়াড় হিসেবে ২০০২ সালে দেশকে সেমিফাইনালে তোলা, এরপর ২০১২ সালে ব্রোঞ্জ মেডেল জেতা হং এবার ডাগআউট থেকে পরিচালনা করবেন দল।
বাছাইপর্বে অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়া
কাতার বিশ্বকাপের পর দুইবার কোচ বদলের ধকল সামলেও হংয়ের অধীনে পুরো এশিয়ার মধ্যে একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করেছে কোরিয়া। বাছাইপর্বে ৬ ম্যাচে জয় তুলেছে নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। আর ৪টি ম্যাচে করেছে ড্র।
২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচ সূচি
গ্রুপ পর্বে দুই মহাদেশের দলের বিপক্ষে খেলবে দক্ষিণ কোরিয়া। ১১ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে মেক্সিকোর এস্তাদিও গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে দক্ষিণ কোরিয়া। ১৮ জুন একই স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো। ২৪ জুন এস্তাদিও মনটেইরি স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে তারা।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
হং মিউংবো অভিজ্ঞ ও তরুণ তারকাদের মিশেলে ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল গঠন করেছেন। যেখানে গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ জো হিউন-উ প্রথম পছন্দ হিসেবে থাকবেন। তার সঙ্গে কিম সেউং-গিউর উপস্থিতি রক্ষণভাগকে আলাদা ভরসা যোগাবে।
বায়ার্ন মিউনিখের তারকা কিম মিন-জের নেতৃত্বাধীন এই ডিফেন্স লাইন বাছাইপর্বে দারুণ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। ঘরোয়া লীগে আলো ছড়ানো লি কিহিউক ব্যাক-আপ হিসেবে দলে গভীরতা বাড়াবেন।
মাঝমাঠে পিএসজির লি কাং-ইন এবং মাইনজের লি জে-সুং বল জোগানোর মূল কারিগর। আক্রমণভাগে দলটির মহাতারকা সন হিউং-মিনের সঙ্গে হোয়াং হি-চ্যানের ক্ষিপ্রতা যেকোনো ডিফেন্স ভাঙার জন্য যথেষ্ট।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
পুরো এশিয়া মহাদেশের মধ্যে একমাত্র দল হিসেবে কোনো ম্যাচ না হেরে (৬ জয়, ৪ ড্র) বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটেছে তারা। দক্ষিণ কোরিয়ার আক্রমণভাগে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা উইঙ্গার সন একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। এছাড়াও ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিবার বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা দলের মানসিক শক্তি বাড়াবে।
বাছাইপর্বে অপরাজিত থাকলেও, বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে ব্রাজিলের মতো বড় দলগুলোর আক্রমণ রুখতে অনেক সময় ডিফেন্স এলোমেলো হয়ে যায়। গ্রুপ পর্বে অবশ্য এই সমস্যায় পড়তে হবে না তাদের। এছাড়াও গত কয়েক বছরে বারবার ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড বদলে যাওয়ায় কৌশলের ধারাবাহিকতায় কিছুটা অভাব দেখা যেতে পারে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
২০০২ সালে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল এশিয়ার দুই দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। ঘরের মাঠের সেই বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া। সেবার ইতালি, স্পেনের মতো দলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল তারা। যা বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের সেরা সাফল্য।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : ২০০২ সালের নায়ক আহন জুংহওয়ান এবং বর্তমান অধিনায়ক সন হিউংমিন ৩টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে বিশ্বমঞ্চে দশেটির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা। সনের সামনে এবার সুযোগ এককভাবে শীর্ষে যাওয়ার।
সনের সামনে রেকর্ড : দেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন বর্তমান কোচ হং মিউংবো। ১০ ম্যাচ খেলা সনের সামনে সুযোগ রয়েছে সেই রেকর্ড ভাঙার।
সবচেয়ে বড় জয় : বিশ্বকাপে বড় কোনো ব্যবধানে জয় নেই কোরিয়ার, তাদের সেরা জয়গুলো ২-০ ব্যবধানের (পোল্যান্ড, গ্রিস ও জার্মানির বিপক্ষে)।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
বর্তমান প্রধান কোচ হং মিউংবো খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে কোরিয়ার উত্থান-পতনের প্রতিটি পরত দেখেছেন। তার ক্ষুরধার মস্তিস্ক আর সন হিউংমিনের বুটের জাদু মিলিয়ে বিশ্বকাপে আবারও ইতিহাস ফেরানোর লক্ষ্য এশিয়ার এই দেশটির। তাদের সবচেয়ে বড় তারকা সন বলেছিলেন, সেমিফাইনালে খেলতে চান তারা।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক: জো হিউন-উ, কিম সেউং-গিউ, সং বুম-কেউন।
ডিফেন্ডার: কিম মিন-জে, চো ইউ-মিন, লি হান-বিওম, কিম টে-হিয়ন, পার্ক জিন-সেওব, লি গি-হিউক, লি টে-সিওক, সিওল ইয়ং-উ, জেনস কাস্ট্রপ, কিম মুন-হওয়ান।
মিডফিল্ডার: ইয়াং হিউন-জুন, পাইক সেউং-হো, হোয়াং ইন-বিওম, কিম জিন-গিউ, বে জুন-হো, ইওম জি-সুং, হোয়াং হি-চ্যান, লি ডং-গিয়ং, লি জে-সুং, লি কাং-ইন।
ফরোয়ার্ড: ওহ হিউন-গিউ, সন হিউং-মিন, চো গুয়ে-সুং।