‘শহীদ জিয়ার আত্মবিশ্বাসই ছিল স্বাধীনতা ও পরবর্তী নেতৃত্বের মূল শক্তি’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গভীর দেশপ্রেম, দূরদর্শিতা ও আত্মবিশ্বাসই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জয় লাভ এবং পরবর্তী রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের মূল শক্তি।

ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এক সুতোয় ঐক্যবদ্ধ করার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

আজ শনিবার (৩০ মে) জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, জিয়াউর রহমানের পুরো জীবনটাই ছিল সফলতায় মোড়ানো। তার সৈনিক জীবন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন, ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসা এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্যু ও কাউন্টার ক্যু’র ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে তার অবর্তন; সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন ছিল একটি সফলতার গল্প। ক্রান্তিকাল উত্তরণে শহীদ জিয়া ছিলেন জাতির দিশারি।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যে দেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এতে খন্দকার মোশতাক সরকারের পতন ঘটে এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হয়। এর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যাকে দেশবাসী সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে গ্রহণ করে। এই অভ্যুত্থানের পর শহীদ জিয়া জাতির উদ্দেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার ও বাংলাদেশকে রক্ষা করার আহ্বান জানান। পরে রাষ্ট্রপতি তাকে সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন।

খন্দকার মোশাররফ আরও বলেন, এ সময় খন্দকার মোশতাকের পরিবর্তে সাবেক প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে বিচারপতি সায়েম শারীরিক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানান। এই পরিবর্তনটি ছিল ঐতিহাসিক, কারণ এর মাধ্যমেই দেশ একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে পুনরায় বহুদলীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসে।

ড. মোশাররফ বলেন, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনা ভোটে ক্ষমতায় না থেকে দেশে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের আয়োজন করেন। সেখানে জনগণ তাকে বিপুল ভোটে সমর্থন জানায়। জনগণের সেই সমর্থন নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে জেনারেল এমএজি ওসমানীকে জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের প্রার্থী করে আওয়ামী লীগ। আর জিয়াউর রহমান প্রার্থী হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের। এই নির্বাচনেও জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন এক বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ও জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি সদ্য স্বাধীন দেশকে এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তাই তিনি ১৯ দফা-সংবলিত রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেন। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য তিনি রাজনীতিতে মেধাবী ও পেশাজীবী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হলো  নারী। তাদেরকে অবহেলিত রেখে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীদের কর্মক্ষম করে তুলতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নেন।

ড. মোশাররফ বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশিদের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ নামের একটি সুনির্দিষ্ট পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, দুর্নীতি ও অনাচার বন্ধ করেছিলেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। খাল খনন করে কৃষিকাজে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বিএডিসি গঠনের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সার, বীজ ও কীটনাশক সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করেন। বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প গড়ে তোলেন এবং বেকার জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় রাজনীতিতে ফেরে। বহুদলীয় রাজনীতির এই পুনঃপ্রবর্তনের ফলে তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসে।

জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন মত ও ধর্মের জাতিগোষ্ঠী বাস করে। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরনও ভিন্ন। তাই জিয়াউর রহমান মনে করেছিলেন, শুধু ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, বরং ভূখন্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত।

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। গ্রামীণ শিল্পের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তিনিই প্রথম পল্লী বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নেন এবং বাপেক্স গঠন করেন। জিয়া কৃষক ও শ্রমিকের কল্যাণে উৎপাদনের রাজনীতি করেছেন; যুব ও নারীশক্তিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

জিয়াউর রহমান উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতিকে সামনে রেখেই বিএনপি গঠন করেছিলেন উল্লেখ করে ড. মোশাররফ বলেন, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিল বিএনপি ধসে যাবে, কিন্তু তা হয়নি। তার অনুপস্থিতিতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নেন। আপসহীনভাবে স্বৈরাচার সরকারকে হঠাতে তিনি দীর্ঘ নয় বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে আর নেই। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই আপসহীন নেত্রীর মতো নেত্রী বাংলাদেশে আর কেউ নেই।

বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই প্রবীণ নেতা বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই দেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন প্রজন্ম যদি তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়, তবে তারাই একদিন বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *