পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা, কে হচ্ছেন বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী? ৯ মে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের দিনক্ষণ ঘোষণা করেছে বিজেপি, যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে শুভেন্দু অধিকারী ও স্বপন দাশগুপ্তের মতো হেভিওয়েট নাম থাকলেও, বর্তমানে সবার নজর কেড়েছেন আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী অগ্নিমিত্রা পাল। তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে তিনি এখন বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।
ফ্যাশন জগত থেকে রাজনীতির শীর্ষে
২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর মাত্র সাত বছরে অগ্নিমিত্রার উত্থান উল্কার গতিতে। আসানসোলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা অগ্নিমিত্রার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ। পরিবারের ইচ্ছা ছিল তিনি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবেন। এমনকি তিনি ডেন্টিস্ট্রি পড়ার সুযোগও পেয়েছিলেন, কিন্তু গাইনোকোলজিস্ট হওয়ার লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় আসানসোল থেকে বোটানিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় সকালে সময় কাটানোর জন্য ভর্তি হন বিরলা ইনস্টিটিউট অফ লিবারাল আর্টস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সে। সেখান থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে ডিপ্লোমা করার পর নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম সম্ভাবনাময় ডিজাইনার।
বাংলার কারুশিল্পকে র্যাম্পে আনা
ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অগ্নিমিত্রা সবসময়ই বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁথা শিল্প ও কারুকার্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ২০০৭ সালের ল্যাকমে ফ্যাশন উইকে যখন তিনি তার কাজ প্রদর্শন করেন, তখন র্যাম্পে তিনি একা হাঁটেননি; তার সাথে ছিলেন দুই নারী কারুশিল্পী। শ্রীদেবী, হেমা মালিনী, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলিউড তারকাদের পোশাক ডিজাইন করেছেন তিনি। এমনকি সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকেও তার ডিজাইনের শাল ও কম্বল উপহার দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে ইঙ্গা নামে নিজের ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচালনা করছেন অগ্নিমিত্রা। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান পরে কলকাতার পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।
বিজেপির ‘তুরুপের তাস’
২০২৬-এর নির্বাচনে অগ্নিমিত্রা পলকে বিজেপির ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপির নারী মোর্চা থেকে দলের কেন্দ্রীয় সার্কেলে তার এই দ্রুত পদোন্নতি দলটির ইতিহাসে বিরল। নিজেকে ‘ভূমিপুত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে আসানসোলকে বিজেপির দুর্গে পরিণত করেছেন তিনি। বিশেষ করে নারী ভোটারদের দলের পক্ষে টানতে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। উদ্যোক্তা পার্থ পলের স্ত্রী এবং দুই সন্তানের জননী অগ্নিমিত্রা রাজনীতিতে এসেছিলেন মূলত সমাজের জন্য কিছু করতে এবং গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে।
মাথায় ঝুলছে ২৩টি মামলা
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, ৫১ বছর বয়সী এই নেত্রীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ২৩টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বেআইনি সমাবেশ, সহিংস বিক্ষোভ, দাঙ্গা, সরকারি আদেশ অমান্য এবং জনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটানোর মতো অভিযোগ রয়েছে। কিছু মামলায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা ছড়ানোর অভিযোগ থাকলেও, কোনোটিতেই তিনি এখন পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হননি।
যদি বিজেপি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প হিসেবে একজন নারী নেতৃত্বকেই বেছে নেওয়া হয়, তবে অগ্নিমিত্রা পালই হতে পারেন দলটির প্রথম পছন্দ। আর তা হলে ফ্যাশন জগত থেকে উঠে এসে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার এক বিরল ইতিহাস গড়বেন তিনি।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়ান নিউজ
এসএন/পিডিকে