মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যখন থমকে গেছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দেওয়া যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। খবর আলজাজিরার।
গতকাল শনিবার ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামীকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন কিছু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরিকল্পনা করছে, যা ইতিমধ্যেই সংকটে থাকা ইরানি অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে।
ইরান ঠিক কী বলেছে?
শনিবার ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসিন রেজাই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ইরান প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের সব দেশের কাছে আবেদন জানাচ্ছে যেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেয়।
‘আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে যে দেশই অংশ নেবে, তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে,’ উল্লেখ করে মহসিন রেজাই ব্যাপক ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাতের বিষয়ে সতর্ক করেন।
রেজাই ইরানের প্রতিবেশীদেরও সতর্ক করে বলেন, তারা যদি ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয়, তবে এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বাইরে থাকা বিকল্প রপ্তানি রুটগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে—এমন অজুহাতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক স্থানে হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) তেহরানের পারমাণবিক বোমার দাবির বিষয়টি সত্য নয় বলে খারিজ করে দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে ডজনখানেকেরও বেশি স্থানে তাদের সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে, যার মধ্যে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো রয়েছে। এছাড়া জর্ডানসহ পুরো অঞ্চল জুড়ে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের ‘সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণার কয়েকদিন পরই রেজাইয়ের এমন বক্তব্য সামনে এলো। ট্রাম্প ইরানকে যেকোনো উপায়ে ‘বাঁচিয়ে রাখার পথ’ করে দেওয়া যেকোনো দেশের জন্য ভয়ংকর অর্থনৈতিক পরিণতির প্রতিশ্রুতির কথা জানান।
পরদিন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই হুমকির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘আপনারা হয় আমাদের পক্ষে, না হয় আমাদের বিপক্ষে।’ তিনি আরও জানান যে, ইরানের ৮০ শতাংশের বেশি তেল কেনা চীনের কাছ থেকেও তাঁরা পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন।
রোববার (২৩ আগস্ট) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে রয়েছে। ওয়াশিংটন যুদ্ধের আগে ভুল ধারণা করেছিল যে, মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ইরান ভেঙে পড়বে এবং ভেনেজুয়েলার মতো অবস্থায় পরিণত হবে।
এক টেলিভিশন ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘শত্রুরা ভেবেছিল ইরান ভেঙে পড়লে এটি ভেননেজুয়েলা হয়ে যাবে। এমনটা তো ঘটেইনি, বরং নিজস্ব প্রতিরোধ, ঐক্য ও সংহতি দিয়ে ইরান নিজেকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে যা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে।’
ইরান কীভাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে?
রেজাই ইরানের এই কৌশলকে একটি তিন ধাপের প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর প্রথম ধাপে থাকবে উত্তেজনা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করা দেশগুলোর সাথে আলোচনা চালানো।
মহসিন রেজাই বলেন, ‘অবশ্যই, আমরা প্রথমে তাদের সাথে আলোচনা করব। আমরা তাদের সাথে কথা বলব এবং বলব যেন তারা সরে দাঁড়ায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। কিন্তু তারা যদি তা না শোনে, তবে আমরা আঘাত করব। আমরা সেই দেশের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু বানাব।’
হরমুজ প্রণালির বাইরের বিকল্প রপ্তানি রুটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার যে সতর্কতা রেজাই দিয়েছেন, তা সম্ভবত লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালিকে নির্দেশ করে। হরমুজ অবরোধের পর সৌদি আরব এই পথটি ব্যবহার করে তেল রপ্তানি করে আসছে। মার্কিন যুদ্ধের জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে এবং তারপর থেকে ওয়াশিংটনের সাথে যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনীও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রেখেছে, যা তেহরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে।
ক্লিংগেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজি শনিবার এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘তেহরান আগেভাগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। তারা সংকেত দিচ্ছে যে, তাদের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিলেও তার বিরুদ্ধে ইরানি প্রতিক্রিয়া শুরু হতে পারে।’
আজিজি জানান, ইরানের নতুন আক্রমণাত্মক নীতিতে দুটি উপাদান প্রকাশ পাচ্ছে: প্রথমত, ‘পূর্ব সতর্কতামূলক প্রতিরোধ’—যার লক্ষ্য সম্ভাব্য কোনো হুমকিকে বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা থামিয়ে দেওয়া; এবং দ্বিতীয়ত, ‘অসম মাত্রার পাল্টা জবাব’—যার লক্ষ্য আঘাত এলে আক্রমণের মূল্য বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
হামিদরেজা আজিজি আরও বলেন, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেওয়া নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি ইরানের এই সতর্কতা মূলত তাদের জন্য একটি চূড়ান্ত সমন বা আল্টিমেটাম। এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরেক দফা চরম উত্তেজনার জন্য নিজেদের ক্রমশ প্রস্তুত করছে।