দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরলেন ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার জুনিয়র। চোটের কারণে ব্রাজিলের প্রথম দুই ম্যাচে দর্শক হয়ে থাকলেও, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ অবশেষে তার দেখা মিলল।
ম্যাচের ৭৫তম মিনিটে ম্যাথিউস কুনিয়ার বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে যেন পুরোনো ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিলেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামলেন তিনি।
আর মাঠে নামার মুহূর্তেই এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন নেইমার। ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ১০ নম্বর জার্সিটি পড়ে আজ বিশ্বকাপে নিজের ক্যারিয়ারের ১৪তম ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। এতেই নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়।
এর আগে কেবল ফুটবল সম্রাট পেলে ও কিংবদন্তি রিভালদো বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সি পড়ে ১৪টি করে ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন। পেলে চার বিশ্বকাপে আর রিভালদো দুই বিশ্বকাপে এই কীর্তি গড়েছিলেন। এবার সেই অভিজাত ক্লাবে নাম লেখালেন নেইমার।
অবশ্য নেইমারের সামনে সুযোগ রয়েছে এককভাবে এই রেকর্ডটি দখলে নেওয়ার। কারণ, ব্রাজিল ইতোমধ্যে নকআউটে কোয়ালিফাই করেছে। ফলে আগামী ম্যাচে নেইমার মাঠে নামলেই এই কীর্তি এককভাবে নিজের করে নেবেন।
নেইমারের এই মাইলফলক ছুঁতে লেগেছে ৪টি বিশ্বকাপ। ২০১৪ বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচ, ২০১৮ বিশ্বকাপে ৫ ম্যাচ, ২০২২ সালে ৩ ম্যাচ এবং চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত এক ম্যাচ মিলিয়ে মোট ১৪ বার তিনি ১০ নম্বর জার্সিতে বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন।
মজার ব্যাপার হলো, এবারের বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে— মরক্কো ও হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড়কে ১০ নম্বর জার্সি পরতে দেখা যায়নি। অতীতে ১৯৬২ সালে কিংবদন্তি পেলে চোটে পড়ার পর এমনটা ঘটেছিল। সেবার টানা তিন ম্যাচে ১০ নম্বর জার্সি শূন্য ছিল। তবে নেইমারের প্রত্যাবর্তনে সেই ধারায় ইতি পড়ল।
জাতীয় দলের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে এখন পর্যন্ত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে ৯৮টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন নেইমার। তার সামনে এখন কেবল কিংবদন্তি পেলে। তিনি ১০ নম্বর জার্সি পরে ১০৫টি ম্যাচ খেলেছিলেন। চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেই নেইমার তার ক্যারিয়ারে ১০ নম্বর জার্সিতে শততম ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন। যদি ব্রাজিল শেষ ১৬- তে কোয়ালিফাই করে আর নেইমার পুরোপুরি ফিট থেকে মাঠে নামে।
৯৮১ দিনের লড়াই শেষে ফিরলেন ব্রাজিলের প্রাণভোমরা
৯৮১ দিন। সংখ্যাটি হয়তো কেবল একটি পরিসংখ্যান। কিন্তু নেইমারের জন্য এটি ছিল অপেক্ষা, যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা আর ফিরে আসার অবিরাম লড়াইয়ের আরেক নাম।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে গুরুতর হাঁটুর চোটে মাঠ ছাড়ার পর যেন থেমে গিয়েছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। এরপর কেটেছে দীর্ঘ পুনর্বাসন, অস্ত্রোপচার আর বারবার নিজেকে ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, ব্রাজিলের জার্সিতে তাকে আর দেখা যাবে কি না।
কিন্তু নেইমার হাল ছাড়েননি। শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন নতুন করে। আর সেই অধ্যবসায়ের পুরস্কার মিলল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের মঞ্চে। ৯৮১ দিন পর আবারও ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে মাঠে নামলেন দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
ম্যাচে তার পায়ে গোল আসেনি। কোনো জাদুকরী মুহূর্তও তৈরি হয়নি। তবু এই রাতটি ছিল শুধুই নেইমারের। বদলি হিসেবে মাঠে নামার পরপরই সেট-পিসের দায়িত্ব নেন তিনি। আর শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগ যেন আর ধরে রাখতে পারলেন না। মায়ামি স্টেডিয়ামের গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দর্শকদের অভিবাদন জানাতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে তার। সেই অশ্রুতে ছিল হারিয়ে যাওয়া সময়ের বেদনা। ফিরে আসার স্বস্তি আর স্বপ্নপূরণের আনন্দ।
একসময় যে চোট তার ক্যারিয়ারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সেই চোটকেই জয় করে আবার বিশ্বকাপের আলোয় ফিরেছেন নেইমার। ৩৪ বছর বয়সে এসে তিনি খেললেন নিজের চতুর্থ বিশ্বকাপ। আর ৯৮১ দিনের অপেক্ষার অবসানের এই রাতটি ফলাফলের চেয়েও বেশি মনে রাখা হবে একজন তারকার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প হিসেবে।
