চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা কেবল টেলিভিশনের পর্দা কিংবা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা যেন ছড়িয়ে পড়েছে ঝিনাইদহের এক শান্ত সবুজ পল্লীতেও। আর সেই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘মুসলিম জাগরণের কবি’ খ্যাত গোলাম মোস্তফার স্মৃতিবিজড়িত আদি বাড়ি।
শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের ঐতিহাসিক এই বাড়িটি এখন ল্যাটিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রঙিন। কবিবাড়ির এই অভূতপূর্ব রূপান্তর পুরো গ্রামকে পরিণত করেছে এক টুকরো ‘ফুটবল ভিলেজে’।
সরেজমিনে মনোহরপুর গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক ভিন্নজগৎ। চারদিকে শুধু ফুটবল আর ফুটবল। রাস্তার দুপাশে উড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা, তবে মূল আকর্ষণ কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি। কবির বাড়ির মূল ফটক, কাচারিঘর, সবুজ আঙিনা, বসতঘর থেকে শুরু করে আশপাশের গাছপালা সবই এখন মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ফুটবল আবেগে। একদিকে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, অন্যদিকে ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ রঙের নান্দনিক দেয়ালচিত্র ও পতাকা শোভা পাচ্ছে। দেয়াল আর বাঁশের খুঁটিতে শোভা পাচ্ছে লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের বিশাল সব প্রতিকৃতি। কোথাও আবার আঁকা হয়েছে কাঙ্ক্ষিত সোনালী ট্রফি।
ফুটবল আর ইতিহাসের এই অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কবিবাড়িতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসছেন। মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অনেকেই।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। কেউ প্রিয় দলের জার্সি পরে, কেউবা পতাকা কাঁধে জড়িয়ে উৎসবে মেতে উঠছে। স্থানীয়রা বলছেন, দলের সমর্থনে ভিন্নতা থাকলেও এই আয়োজন পুরো গ্রামের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছে। এটি এখন শুধু ফুটবল উন্মাদনা নয়, বরং সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা।
ফরহাদ হোসেন নামে এক যুবক মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে বিশ্বাস করতে পারিনি। এখানে এসে মনে হচ্ছে কোনো বিদেশি ফ্যান জোনে দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামীণ আবহে এমন নান্দনিক আয়োজন সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা সিজার জিকরুল বলেন, ‘বিশ্বকাপ এলেই গ্রামে আনন্দ হয়, কিন্তু এবার কবিবাড়িকে কেন্দ্র করে যে সাজসজ্জা হয়েছে, তা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের আগমনে আমাদের গ্রামজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ।’
এই বর্ণিল উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন স্থানীয় একঝাঁক উদ্যমী তরুণ। কয়েক সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা কবিবাড়ি ও আশপাশের এলাকাকে এভাবে সাজিয়ে তুলেছেন।
তরুণ সংগঠক শাওন শ্রাবণ ও শিহাব হোসেন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপের বৈশ্বিক আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে মাঠের খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করা। নিজেদের পকেটের টাকায়, নিজেদের পরিশ্রমে এই আয়োজন করেছি। দর্শনার্থীদের হাসিমুখ আর ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
বিশ্বকাপের মাঠের লড়াই যত জমছে, মনোহরপুরের কবিবাড়িতে দর্শনার্থীদের আনাগোনা ততই বাড়ছে। ফুটবল আর ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধন যেন প্রমাণ করছে—খেলাধুলা শুধু মাঠের লড়াই নয়, তা মানুষের হৃদয়কে এক করার এক শক্তিশালী মাধ্যম।