বিজেপি সমর্থক পরিবারের মেয়ে সিইসির পদত্যাগ আন্দোলনের ‘অন্যতম মুখ‘ নেহা

‘দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে।’ গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক তরুণী। তখন তার গলা ভাঙা ছিল। কথা বলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তিনি আর কেউ নন, ভারতের বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘আইসা‘র সভাপতি নেহা বোরা। খবর বিবিসি বাংলার।

সংগঠনটি মূলত নকশালপন্থী রাজনৈতিক দল সিপিআইএমএল-এর (লিবারেশন) ছাত্র শাখা। ভারতে এ পার্টির বর্তমানে দুজন সংসদ সদস্য এবং চারজন বিধায়ক রয়েছেন। তবে আইসা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এককভাবে বেশ সক্রিয়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার মাত্র একদিন আগেই দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হন নেহা। যন্তর মন্তর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলা এলাকায় তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পুলিশের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তিও হয়। তাই মঞ্চে উঠে তিনি বলেন, তার ভাঙা শরীরের মতোই অবস্থা যাদবপুর ও এসআরএফটিআই-এর।

আন্দোলনের সূচনা ও রাজপথের লড়াকু ভূমিকা

নেহা বোরার এই আলোচনার সূচনা ২০২৬ সালের জুলাই মাসে। সে সময় ভারতে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে অভিজিৎ দীপকে ও সোনম ওয়াংচুকের অনশনে সঙ্গীদের নিয়ে যোগ দেন নেহা।

এরপর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাঁচি যান তিনি। সেখানে তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়। কিন্তু তিনি দমে যাননি। বোরা বলেন, মুখে কালি মারলে আমি ভয় পাব না। দিল্লিতে আমি প্যালেট গান ও লাঠিচার্জ দেখেছি। কালি ছিটিয়ে কি তরুণদের ক্ষোভ দমানো যাবে? পরে তিনি বিহারে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেন।

বর্তমানে তিনি দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনে নেমেছেন। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার অনিয়মের কারণে কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এ বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস‘ এক প্রতিবেদনে তিন নির্বাচন কমিশনারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য তুলে ধরেছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজনীতি থেকে জাতীয় আন্দোলন

নেহা বোরার মূল বাড়ি উত্তরাখণ্ডে। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। বর্তমানে তিনি দিল্লির বিখ্যাত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন। ক্যাম্পাসের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি এখন সারা ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের প্রধান মুখ।

‘ফ্রন্টলাইন‘ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেন, আন্দোলন মানুষকে অধিকার আদায়ের পথ দেখিয়েছে। যন্তর-মন্তরের এক পোস্টারের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা গডসকে বিশ্বাস করেন, আমরা ভগৎ সিংকে বিশ্বাস করি। যারা গডসের রাজনীতি করে, তারা দেশ শাসন করতে পারে না।‘ তিনি মনে করেন, এই সংগ্রাম দেশজুড়ে তরুণদের একে অপরের জন্য লড়তে শিখিয়েছে।

পরিবারের রাজনৈতিক মতপার্থক্য

নেহা এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক পছন্দ বিজেপি। ফলে পরিবারে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হয়। তবে পড়ালেখার দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষ থেকেই তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা পান।

বিবিসিকে দেওয়া ইন্টারভিউতে তিনি জানান, যন্তর-মন্তরের আন্দোলনে অনেক বিজেপি-সমর্থক মা-বাবাও এসেছিলেন। এমনকি তার নিজের মা-ও পুলিশের কঠোর ভূমিকা দেখে আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেছিলেন। নেহার মতে, এটি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

তুলনা নয়, সংহতির রাজনীতি

গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি আলোচনা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা করে মানুষ বিতর্ক শুরু করেছেন, যে কে বেশি ‘ম্যাচিউর‘।

এক্সে এক ইউজার, অ্যামক, নেহা বোরার ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ম্যাচিউরিটি হলো, যখন আপনি বুঝতে পারবেন যে নেহা বোরা অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। তিনি জেন-জি প্রজন্মের একেবারে আইকন, আর তার স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব দুর্দান্ত।

এই পোস্টটি পুনরায় শেয়ার করে অভিজিৎ দীপকে নিজেই লিখেছিলেন, আমি এর সঙ্গে একমত। এই পোস্টের কিছুক্ষণ পরই নেহা এক্সে লিখেছিলেন, তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি। এর জবাবে অভিজিৎ লিখেছিলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।

সিজেপির আন্দোলনের সময়ে যন্তর-মন্তরে এক বিক্ষোভে বক্তৃতা দিতে গিয়ে নেহা বোরা নিজেও বলেছিলেন যে দীপকে বিনয়ী, অন্যদের পরামর্শ গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকেন। তিনি আন্দোলনকারীদের এই উপলব্ধি করিয়েছেন যে, তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন ছাত্র ও সহযোদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *