দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ বছর ফ্রান্সে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলে তিন লাখ একরের বেশি এলাকা পুড়ে যাওয়ার পর আগুনের কারণ ও দায় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ দাবানল মানুষের কারণে শুরু হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অতিরিক্ত তাপ দাবানলকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে বা দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগানোর অভিযোগে এখন পর্যন্ত ৪২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। খবর বিবিসির।
তবে এত বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও সংবাদমাধ্যমের একাংশ। আইনজীবী মুরিয়েল গেস্তা বলেছেন, গ্রেপ্তারের সংখ্যা তার কাছে অতিরিক্ত বলে মনে হয়েছে। তার আশঙ্কা, অনেক মামলায় শেষ পর্যন্ত দোষ প্রমাণিত নাও হতে পারে।
অন্যদিকে, ফরাসি সংবাদপত্র লে মন্ড প্রশ্ন তুলেছে—এত অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ এসব মামলার তদন্ত কতটা গভীরভাবে করেছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ ও দুর্ঘটনাজনিত আগুনের মধ্যে পার্থক্য এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারের গ্রেপ্তারের সংখ্যা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে বোর্দোর প্রসিকিউটর রেনো গোদেল কঠোর অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তার মতে, বনাঞ্চলে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলা বা বারবিকিউ করার মতো অসতর্ক কাজও এখন মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। কারণ প্রচণ্ড খরা ও তাপের মধ্যে সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ থেকেই বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দাবানল কীভাবে শুরু হয়েছে, তা শনাক্ত করা সহজ নয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্তকারীরা প্রথমে পুড়ে যাওয়া এলাকার সীমানা চিহ্নিত করেন। এরপর আগুনের বিস্তারের বিপরীত দিকে এগিয়ে গিয়ে আগুনের সম্ভাব্য উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা এরিক ডুফায়ে জানান, বাতাস স্থির থাকলে আগুনের পোড়া এলাকার আকৃতি অনেক সময় ‘ভি’ আকৃতির হয়। সেখান থেকে আগুনের গতিপথ অনুসরণ করে সম্ভাব্য উৎস নির্ধারণ করা হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মিশেল লেজুয়ের মতে, আগুন লাগানোর সঙ্গে জড়িত মানুষকে মোটামুটি তিন ভাগে দেখা যায়—অসতর্ক ব্যক্তি, আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে আগুন লাগানো ব্যক্তি এবং পাইরোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি। তবে পাইরোম্যানিয়া অত্যন্ত বিরল এবং এটি শনাক্ত করাও কঠিন।
কিছু ক্ষেত্রে দমকলকর্মীদের বিরুদ্ধেও ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। আইনজীবী গেস্তার মতে, কেউ কেউ আগুন লাগিয়ে পরে উদ্ধারকর্তা হিসেবে পরিচিত হতে চাইতে পারেন। আবার স্বেচ্ছাসেবী দমকলকর্মীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আয়ও সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে।
গ্রেপ্তার ও তদন্ত নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও ফ্রান্সে দাবানলের ঝুঁকি কমছে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরেকটি তাপপ্রবাহ কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটিতে আঘাত হানতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, এখনই সমালোচনার চেয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন ধরনের বন গড়ে তুলতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠন করতে হবে।
তবে দাবানলে পরিবেশ, শত শত বাড়িঘর, পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা ও বায়ুর মানের যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে ফরাসি জনগণের মধ্যে আগুনের কারণ, প্রস্তুতি এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।