ফরিদপুরে ৭৮১টি মন্দিরের একটিতেই সাজানো হচ্ছে ২৭৭ প্রতিমা। শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী হরি মন্দিরে এক সঙ্গে সাজানো হচ্ছে ২৭৭ প্রতিমা। এই বৃহৎ মন্দিরের প্রতিমা দেখতে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী ভিড় করে। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও ধারণা করা হচ্ছে এই মন্দির দেখতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভক্তরা সমবেত হবেন।
শারদীয় দুর্গাপূজার এই মহাআয়োজনে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। শরতের আকাশজুড়ে যেমন উৎসবের আমেজ, ঠিক তেমনি মণ্ডপজুড়ে ফুটে উঠেছে দেব-দেবীর নান্দনিক রূপ ও লোকজ ঐতিহ্যের বর্ণিল চিত্র। গতবার ২৫১টি প্রতিমার সাফল্য টপকে এবার প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে ২৭৭ প্রতিমা।
উদযাপন কমিটির মতে, গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় পূজা প্রদর্শনীর রূপ নিতে যাচ্ছে। উপজেলা সদরের কুসুমদি গ্রামের এই সুপ্রাচীন হরি মন্দিরে ২০০৫ সাল থেকে নিয়মিত দুর্গাপূজা পালিত হচ্ছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, এবার টানা পঞ্চমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে প্রতিমা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় নতুন করে ২৬টি প্রতিমা যোগ হওয়ায় মণ্ডপজুড়ে এসেছে ভিন্ন মাত্রা ও নানামুখী বৈচিত্র্য।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুবিশাল মণ্ডপজুড়ে আবহমান বাংলার পৌরাণিক ও রূপকথাচিত্র ধারণ করা হয়েছে। যেখানে ঠাঁই পেয়েছে বেহুলা-লখিন্দরের রোমাঞ্চকর আখ্যান, নবদুর্গার নানা রূপ থেকে শুরু করে নানান লোকজ গল্প। মাটির কাজ, খড় সাজানো ও রঙ তুলির প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে ইতোমধ্যে কারিগররা বিদায় নিয়েছেন।
সাতক্ষীরার দেবহাটা থেকে আসা প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী নীলরঞ্জন পাল ও তার সহযোগী কারিগররা দীর্ঘ দুই মাসের ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টায় প্রতিমাগুলো গড়ে তুলেছেন। কারিগররা চলে গেলেও মণ্ডপে জ্বলজ্বল করছে তাদের হাতের নিপুণ কাজ। বর্তমানে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে দ্রুতগতিতে চলছে আধুনিক আলোকসজ্জা, ফটক নির্মাণ, প্যান্ডেল সাজানো ও দৃষ্টিনন্দন আলপনা আঁকার কাজ।
আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার শুভসূচনার মধ্য দিয়ে মণ্ডপের দুয়ার উন্মুক্ত হবে এবং ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকবে এই প্রাঙ্গণ।
এই পূজা উদযাপনের সঙ্গে জড়িত ডা. সুমন রায় বললেন, আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল ধর্মীয় আচার পালন নয়, বরং প্রতিমার মাধ্যমে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা। দর্শনার্থীরা যাতে নিরাপদে ও সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমাগুলো দর্শন করতে পারেন, সেজন্য পুরো এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
আলফাডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক প্রবীর কুমার বিশ্বাস জানান, ব্যতিক্রমী এই প্রদর্শনী এক নজর দেখতে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারত থেকে প্রচুর দর্শনার্থী আসেন। এবার প্রতিমা সংখ্যা আরও বাড়ানোয় ভক্তদের সমাগম বিগত বছরগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। কয়েক লাখ মানুষের উপস্থিতি আশা করছি আমরা।
উৎসব ঘনিয়ে আসতেই আলফাডাঙ্গা অঞ্চলজুড়ে বইছে উৎসব মুখর হাওয়া। সন্ধ্যা নামলেই আলো ঝলমলে পরিবেশে ২৭৭টি প্রতিমা রূপ নেবে এক অনন্য পৌরাণিক নাট্যমঞ্চে।
ফরিদপুরে এবার ৭৮১টি মন্দিরে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে জোরেসোরে। পূজাকে লক্ষ্য রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পীরা। দিনরাত প্রতিমা শিল্পীরা ব্যস্ত প্রতিমা তৈরির কাজে। জেলার প্রতিটি মন্দির সাজতে শুরু করেছে নানা আয়োজন নিয়ে। জেলায় আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি রয়েছে শেষ পর্যায়ে। মন্দিরের আলোকসজ্জা ও ডেকোরেশনের প্রস্তুতি চলছে একই সঙ্গে। ১৯৮টি পূজামণ্ডপ সদর উপজেলা এবং ফরিদপুর পৌরসভায়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো শারদীয়া দুর্গাপূজা। এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসছেন। শাস্ত্র মতে এর ফল ছত্রভঙ্গ বা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়। দেবী নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী নৌকায় দেবীর গমন শস্যবৃদ্ধি ও মনোকামনা পূরণের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কার কথাও বলা হয়।
আগামী ১৬ অক্টোবর বৃহস্পতিবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু দূর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর (শনি ও রোববার) সপ্তমী তিথি দুই দিন ধরে থাকবে। এ কারণে পূজার সময় একদিন বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর পর দেবীকে বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গাপূজা।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বলেন, এবারের দুর্গাপূজাকে নির্বিঘ্নে করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। আশা করি সুন্দরভাবে আমরা শারদীয় দুর্গোৎসব পালন করতে পারব জেলায়।