জাতীয় সংসদে পেট্রোল পাম্প ঘুরেও নিজের গাড়ির জন্য তেল না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম। তার এ অভিযোগ সমর্থন করেছেন আরেক সংসদ সদস্য।
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সংসদে দাঁড়িয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই; অতিরিক্ত মজুত প্রবণতার কারণেই এই কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৭১ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে এমপি আনোয়ারুল ইসলাম তেল না পাওয়ার এই অভিযোগ তোলেন।
এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।
আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আজকে যদিও তেল নিয়ে কথা উঠেছে (সংকট নেই বলে জানানো হয়েছে), তবে আজকে আমি নিজেও কয়েকটি পাম্পে ঘুরে আমার গাড়িতে তেল পাইনি।
তার এ বক্তব্যকে সমর্থন জানান সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম।তিনি বলেন, তার এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতেও পেট্রোল ও অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। তবে চালকরা বাইরে থেকে বোতলে করে ঠিকই মোটরসাইকেলের তেল কিনছেন।
তবে একই দিন সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জোর দিয়ে বলেন, দেশে সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও সরকারের বেশি প্রস্তুতি ও মজুত রয়েছে।
তিনি বলেন, একটি বিষয়ে সকলকে পরিষ্কারভাবে অবহিত করতে চাই—আমাদের মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক।অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রোলের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ৬ থেকে ৬.৮ শতাংশের মধ্যে। সুতরাং ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল বা অকটেনের জন্য দীর্ঘ লাইনের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা জ্বালানির প্রকৃত সংকটের প্রতিফলন নয়; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুত প্রবণতার কারণে সৃষ্ট একটি কৃত্রিম চাপ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের অস্থিতিশীলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে সরকার সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
জ্বালানির মজুত প্রসঙ্গে মন্ত্রী সংসদকে জানান, গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে।২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন তেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে। এই ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য মজুত বজায় থাকা সরকারের কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
প্রকৃত চাহিদার তুলনায় বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গত বছর মার্চ মাসে দৈনিক ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন এবং অকটেন ও পেট্রোল ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ ও ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। অথচ চলতি বছর মার্চে অকটেনের ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একটি মোটরসাইকেল দিনে একাধিকবার এসে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি সংগ্রহ করছে।
সরকার ডিজেলের পাশাপাশি অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিল মাসে ৫০০ মেট্রিক টন অকটেন আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকেও সরবরাহ পাওয়া যাবে।
কৃত্রিম সংকট তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ইতোমধ্যে সরকার ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, ৭৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ১৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে ১ লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ২২ হাজার লিটার অকটেন এবং ২৩ হাজার লিটার পেট্রোলসহ মোট ২ লাখ ৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে সরকার ভবিষ্যতেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
এসএন/পিডিকে