২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের কেরালায় এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে পাকিস্তানের নেতাদের সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কাশ্মীরে সেনা ক্যাম্পে হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহতের জবাবে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানকে একঘরে (আইসোলেট) করতে ভারত সফল হয়েছে ও এই চেষ্টা আরও জোরদার করা হবে।
কিন্তু এক দশক পর- ২০২৬ সালে এসে ভূ-রাজনীতির চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে একঘরে করার ভারতের যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল, তা বিশ্লেষকদের মতে এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের ভাষায়, পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ও বিশ্বপর্যায়ে কোণঠাসা করার ভারতের কৌশলটি উল্টো তাদের ওপরই বড় ধাক্কা হিসেবে ফিরে এসেছে।
ঠিক কী কী কারণে মোদির এই নীতি ব্যর্থ হলো এবং কীভাবে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবার সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এলো :
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের রসায়ন
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। গত এক বছরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির দুজনেই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এমনকি আমেরিকার দীর্ঘদিনের শত্রু ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান যুদ্ধে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। ট্রাম্প নিজে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তাঁর ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শাল’ ও একজন ‘অসাধারণ মানুষ’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন, যা ভারতের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের যুদ্ধ ও ট্রাম্পের মধ্যস্থতা
২০২৫ সালের মে মাসে কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলার জের ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতের বিমান হামলার পর দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ বেঁধে যায়। এই যুদ্ধ থামাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন ও দুই পক্ষকে একটি ‘পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ চুক্তিতে আনতে সক্ষম হন।
পাকিস্তান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের এই ভূমিকার প্রশংসা করে এবং তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের এই তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের আমন্ত্রণে যেতেও না করে দেন। ভারতের এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষুব্ধ করে এবং ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কে বড় ফাটল ধরায়।
আন্তর্জাতিক স্তরে প্রমাণের অভাব
যুদ্ধের সময় ভারতের বেশ কয়েকটি ফাইটার জেট পাকিস্তান গুলি করে ভূপাতিত করে। প্রথমে ভারত বিষয়টি চেপে রাখলেও পরে ভারতের শীর্ষ জেনারেল তা স্বীকার করতে বাধ্য হন। এ ছাড়া কাশ্মীরের পেহেলগামে যে হামলার কারণে ভারত যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই হামলায় পাকিস্তানের সরাসরি জড়িত থাকার কোনো অকাট্য প্রমাণ বিশ্বদরবারে নয়াদিল্লি উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে বিশ্বজুড়ে প্রচারণার লড়াইয়ে (ব্যাটল অফ ন্যারেটিভস) পাকিস্তান জিতে যায়।
আঞ্চলিক সংযোগ থেকে ভারতের সরে আসা
পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-কে কার্যত অচল করে দিয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ভারত সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করে আসছে। কিন্তু এর ফলে ভারত নিজেই প্রতিবেশীদের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সাথে পাকিস্তানের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ‘অটুট’ রয়েছে, যা গত মে মাসে শাহবাজ শরিফের বেইজিং সফরের সময় চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েল নীতি
মোদি সরকারের আমলে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান থেকে সরে এসে ইসরায়েলের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র ক্রেতা ও ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। গাজায় চলমান যুদ্ধ বা ইসরায়েলের অন্যান্য সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভারত একবারের জন্যও তীব্র নিন্দা জানায়নি। মোদির এই কট্টর ইসরায়েল-ঘেঁষা নীতি ও ভারতের অভ্যন্তরীণ মুসলিমবিদ্বেষী রাজনীতি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে এই সুযোগে পাকিস্তান তেলসমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গভীর করেছে। গত বছর সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে, যেখানে তুরস্কের মতো দেশও যুক্ত হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বর্তমানে ইতিহাসে সবচেয়ে সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে। তবে ভারতের বিশাল অর্থনীতি ও বিশাল বাজারের কারণে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না। সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ও পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে হলে ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ব্যাক-চ্যানেল’ বা গোপন কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। কাশ্মীর সমস্যার একটি গণতান্ত্রিক সমাধান ছাড়া এই অঞ্চলের স্থায়ী সমৃদ্ধি সম্ভব নয়।