নেপালে স্মরণকালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মৃতদেহ উদ্ধারের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গতকাল বুধবারের (২৬ আগস্ট) ভূমিধস থেকে ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধসের ফলে সৃষ্টি হওয়া এই আকস্মিক বন্যার উৎপত্তি নিয়ে যখন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে, তখন বিজ্ঞানীরা আরও দুটি আকস্মিক বন্যার ‘আঘাতের’ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলা না গেলেও ‘দ্বিতীয়’ এবং ‘তৃতীয়’ আঘাত আবারও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এজন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও তুলে ধরছেন। খবর বিবিসি ও নেপাল টাইমসের।
এ বিষয়ে নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী বলেছেন, আজ বা আগামীকাল দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।
বসন্ত রাজ অধিকারী বলেন, ‘আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না এটি কখন ঘটতে পারে।’ তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী চীনের সহকর্মীদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চ মাত্রার বৃষ্টিপাত এখন আর ঘটছে না, তবে ভূমিধস ঘটতে পারে।’
বসন্ত রাজ অধিকারী আরও জানান, তারা অনেকদিন থেকেই হিমালয় পর্বতমালার প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া আসলেই ঘটছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, তবে একটি নির্দিষ্ট দিনে হঠাৎ এমনটি ঘটবে তা আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।’
নেপালের এই ভয়াবহ আকস্মি বন্যায় ইতোমধ্যে মৃতের সংখ্যা ২৭০ ছাড়িয়ে গেছে এবং আরও প্রায় দেড় হাজারের মতো লোক নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
গতকাল বুধবারের ঘটনার বিষয়ে প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছেন। নেপাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে চীন সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পনের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাংটাং পর্বতের উত্তর পিঠে এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ঘটে। নেপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই পর্বত থেকে ধসে পড়া বিশাল বর্জ্য ও পাথর বর্ষায় স্ফীত নেপাল-চীন সীমান্ত নির্ধারণকারী লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরে সেখানে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদটি ফেটে গেলে পলি, পাথর ও কাদার এক দানবীয় ঢল ত্রিশুলি নদী দিয়ে নেপালের দিকে প্রবল বেগে নেমে আসে।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, ধসের কারণেই এই বিপর্যয়। তবে ভূকম্পন ধস ঘটিয়েছে নাকি বিশালাকার ধসটিই ভূকম্পিক তরঙ্গ তৈরি করেছে, তা নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পর্বতের বরফ এমনিতেই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল এবং বর্ষার শেষভাগে পাহাড়ের ঢাল ভারি হয়ে পড়ায় এই ধস চরম রূপ নেয়। হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, পারমাফ্রস্ট বা ভূগর্ভের হিমায়িত অংশ গলে যাওয়ার ফলে এমন আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এর আগে ২০২১ সালে চামোল, একই বছরে মেলামচি, ২০২৩ সালে সিকিম, ২০২৪ সালে থামে এবং ২০২৫ সালের ভোতে কোশী প্লাবনের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও বর্ষাকালেই একই ধরনের প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় ঘটলো।