দুই বছরের মাথায় একই খাল ফের খনন, ৩০ টাকার গাছে ৫০১ টাকার ভাউচার

যশোরের কেশবপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া খাল খননে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে খনন করা একই খালে মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুনরায় বরাদ্দ এনে সরকারি অর্থের সিংহভাগ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া খালের পাড়ে ৫ থেকে ৩০ টাকা মূল্যের ছোট ছোট চারা গাছ রোপণ করে প্রতিটির বিপরীতে ৫০১ টাকা করে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি ও এক্সকাভেটর চালানোর খরচেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খাল খনন বাস্তবায়নে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেশবপুর উপজেলার ধর্মপুর ব্রিজ থেকে ৩ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁশবাড়িয়া খাল খননের জন্য ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৩ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে তা শেষ দেখানো হয়। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কামরুল ইসলামকে প্রকল্পের সভাপতি করা হলেও মূলত ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুলই কাজটি পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন খাল খননের কাজ করা হয়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা করে কাজ করা হলে দুটি এক্সকাভেটরের মোট কাজের সময় ১০০ ঘণ্টার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ প্রকল্পের কাগজপত্রে ৭৯৫ ঘণ্টার বেশি এক্সকাভেটর চালানোর হিসাব দেখিয়ে ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৭ টাকার বিল করা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে যত সময় কাজ করা হয়েছে, কাগজে তার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি সময় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুল বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তাকে দুই দফায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেখিয়ে মোট ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা ব্যয় হিসেবে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় খালের দুই পাড়ে ৩০০টি বনজ ও ফলজ গাছ রোপণের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ৪২৩ টাকা বরাদ্দ ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের একাংশে সামান্য কিছু গাছ লাগানো হলেও মেহেরপুর এলাকায় কোনো গাছই লাগানো হয়নি। খালের পাড়ে রোপণ করা অতি ক্ষুদ্র চারাগুলোর বাজারমূল্য ৫ থেকে ৩০ টাকা হলেও ভাউচারে প্রতিটি গাছের দাম ৫০১ টাকা করে দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রকল্পে ১১৪ জন শ্রমিকের প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও শ্রমিকদের ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শ্রমিক জানান, বাস্তবে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। অথচ কাগজপত্রে পুরো মেয়াদে শ্রমিক কাজ করেছেন দেখিয়ে ভাউচার করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাঁশবাড়িয়া খালটি ইতোমধ্যে খনন করা হয়েছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো স্থানে একবার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সেখানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই।

স্থানীয় কৃষিবিদ ওয়াজেদ খান ডবলু বলেন, খালের পাড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বনায়নের জন্য সাধারণত উন্নত জাতের মাঝারি আকারের কাঠ বা ফলজ চারা রোপণ করা হয়। স্থানীয় নার্সারিগুলোতে মানভেদে এ ধরনের চারার সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৩০ থেকে ৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। সেখানে প্রতিটি চারার দাম ৫০১ টাকা দেখানো সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ও অস্বাভাবিক।

ওয়াজেদ খান ডবলু আরও বলেন, খালের পাড়ে যেসব অতি ক্ষুদ্র চারা রোপণ করা হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর বর্তমান বাজারদর সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৩০ টাকা। সরকারি কোনো প্রকল্পে বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে ভাউচার করা হলে তা বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।

প্রকল্পের ট্যাগ কর্মকর্তা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইয়াছির আরাফাত বলেন, খাল খননে কত টাকা বরাদ্দ, তা আমার জানা নেই। আমি শুধু মাঝে মাঝে গিয়ে শ্রমিকরা হাজির আছে কি না, তা দেখেছি। খাল পরিমাপের কোনো তালিকাও আমাকে দেওয়া হয়নি। গাছ লাগানোর বিষয়েও আমাকে কিছু জানানো হয়নি। তবে গাছগুলো যা দেখছি, এর দাম এত টাকা হওয়ার কথা নয়।

প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমাকে সভাপতি করা হলেও দলীয় লোকজন কাজ করেছে। গাছ আমরা কিনেছি, কিন্তু গাছগুলো ছোট হয়েছে।

কামরুল ইসলাম আরও বলেন, ওই খাল দুই বছর আগে খনন করা হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।

তবে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী দেবদাস বিশ্বাস বলেন, প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে এবং গাছের ক্ষেত্রেও কোনো দুর্নীতি হয়নি। আমি মাঝে মাঝে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছি। তবে আগের অর্থবছরে খালটি খনন করা হয়েছিল কি না, তা আমার জানা নেই।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের সরেজমিন পরিদর্শন শেষে বলেন, প্রাথমিক দৃষ্টিতে খাল খনন ও গাছ রোপণে কিছুটা দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গাছ ও খাঁচা মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা খরচ হতে পারে। তদন্ত শেষে অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *