ডারউইনের মাঠে সে দিন কী নান্দনিক ব্যাটিংই না উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ! অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বসেরা বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়েও টাইগার ব্যাটারদের মধ্যে কোনো ভয়ডর দেখা যায়নি। অসি বোলাররা উইকেটের জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা করলেও সুযোগ পাচ্ছিলেন না। সত্যি বলতে, বোলারদের সুযোগ না দিয়ে বরং শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা।
প্রথম টেস্টে প্রথম এক ঘণ্টা কোনো উইকেট না হারিয়ে যেভাবে দুই ওপেনার দলের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ বদলে দিযেছিল। যার ওপর ভর করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।
তবে ভেন্যু বদলাতেই যেন পুরোপুরি বদলে গেল দৃশ্যপট। ডারউইন থেকে ম্যাকাই—কয়েক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে এত বড় পরিবর্তন আসবে, তা হয়তো ক্রিকেটপ্রেমীদের কল্পনাতেও ছিল না। যে ওপেনিং জুটি আগের ম্যাচে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল, তারা ম্যাকাইতে টিকে থাকলেন সব মিলিয়ে মাত্র ৩ বল।
বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে ১২ রান উঠতেই সাজঘরে ফিরে গেলেন দলের প্রথম ৫ ব্যাটার! সময় লেগেছিল মাত্র ৬.৪ ওভার। মিচেল স্টার্কের গতি, বাউন্স আর সুইংয়ের সামনে যেন একপ্রকার নাস্তানাবুদ অবস্থা টাইগার ব্যাটারদের। ম্যাচের শেষ দিকে টেল-এন্ডারদের কিছুটা লড়াইয়ের কারণে হয়তো লজ্জার রেকর্ডের হাত থেকে বেঁচেছে দল, তবে অলআউট হতে হয়েছে মাত্র ৬৪ রানে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ডারউইনে ইতিহাস গড়া সেই বাংলাদেশ দল মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এমন ব্যাটিং ধসে পড়ল কেন? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন, কারণ একটি নয়, বরং বেশ কয়েকটি ভুল আর পরিস্থিতির শিকার হয়ে এই ব্যর্থতায় ডুবেছে টাইগাররা।
কন্ডিশন ও উইকেটের আচরণ
ম্যাচ শুরুর আগেই মাঠের কিউরেটর কাজাকফ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে উইকেট নিয়ে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উইকেটে শুরুর দিকে ব্যাটারদের জন্য টিকে থাকা বেশ কঠিন হবে। এমন ইঙ্গিতের পর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স টস জিতে বোলিং নিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি। আর উইকেটের সেই সুবিধাটা পুরোপুরি কাজে লাগালেন মিচেল স্টার্ক।
নতুন বলে গতি, সুইং আর অতিরিক্ত বাউন্স আদায় করে নিয়ে একের পর এক ব্যাটারকে পরাস্ত করেন তিনি। প্রথম ৭ ওভারের মধ্যেই ৫ উইকেট হারিয়ে যে ধাক্কা বাংলাদেশ খেয়েছিল, সেখান থেকে আর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
তবে একে ব্যর্থতার একমাত্র অজুহাত বলা যাবে না, কারণ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে যেকোনো বৈরী কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকাটা জরুরি। যেটি দেখাতে ব্য়র্থ হয়েছেন মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিমরা।
ভুল শট নির্বাচন
বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের পেছনে যতটা অস্ট্রেলিয়ার কৃতিত্ব আছে, ঠিক ততোখানিই বাংলাদেশের ব্যাটারদের ভুলও আছে। টেস্ট ক্রিকেটে ওভারের হিসেব না কষে করতে হয় দিনের হিসেব। এগুতে হয় সেনশন বাই সেশন। স্টাম্পের বাইরের বলগুলোতে অপ্রয়োজনীয় শট না খেলে ছেড়ে দেওয়াই এখানে মূল কৌশল। বাংলাদেশ ঠিক সেখানেই ভুল করেছে। টপ অর্ডারের অধিকাংশ ব্যাটারই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছেন। অথচ এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বল খুব সহজেই ছেড়ে দেওয়া যেত।
তানজিদ হাসান তামিম কিংবা মুমিনুল হক যেভাবে আউট হয়েছেন, ধারাভাষ্য কক্ষ থেকেও সেটাকে ‘অলস শট’ এবং ‘নাথিং শট’ বলে মন্তব্য করা হচ্ছিল। এতেই স্পষ্ট বোঝা যায়, ব্যাটাররা কতটা ভুল মনোভাব নিয়ে ব্যাটিং করেছেন।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং লাইনআপ যে বিশ্বসেরা, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। ডারউইনে তাদের বিপক্ষে যেভাবে ডমিনেট করে ব্যাট করেছিল টাইগাররা, সেখান থেকে ব্যাটারদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।
ম্যাকাইতে এসে সেই বিশ্বাসটাই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে রূপ নেয়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে উইকেটে এসেই সেট না হয়ে শট খেলতে গিয়েছেন ব্যাটাররা। যার মাশুল দিতে হয়েছে দ্রুত উইকেট হারিয়ে।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ
ডারউইনে ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারানোর কীর্তি গড়েছিল টাইগাররা। এরপর দলের ওপর সমর্থকদের চাওয়া অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ যে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করতে পারে, সেই বিশ্বাস জন্মেছিল সমর্থকদের মাঝে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় টেস্টেও ভালো করবে এই প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল সমর্থকদের।
সেখান থেকেই হয়তো অতিরিক্ত কিছু করার চিন্তা দেখা দিয়েছিল ব্যাটারদের মাঝে। যে কারণে প্রথম ম্যাচে যেভাবে নিজেদের স্বাভাবিক ব্যাটিং করেছিলেন সাদমান ইসলাম-তানজিদ হাসান তামিমরা, দ্বিতীয় ম্যাচে সেটি করতে পারেননি তারা। যেকারণে অতিরিক্ত কিছু করতে গিয়ে বিলিয়েছেন উইকেট। আর তাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ।