জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক প্রধান নাভি পিল্লাই এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে রসিকতা করে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কারটি ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেবেন তিনি। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের।
নোবেল কমিটির প্রধান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকান এই বিচারপতি ও আইন বিশেষজ্ঞকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে, কারণ তিনি ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন’।
নোবেল কমিটির প্রধান আরও বলেন, এমন এক সময়ে এই পুরস্কার দেওয়া হলো যখন আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আসছেন এবং এটি তিনি গোপনও করেননি। অতীতে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি পাওয়ার জন্য তিনি নোবেল কমিটির ওপর ব্যাপক চাপও সৃষ্টি করেছিলেন।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এমন সব কাজ করেছি, যা অন্য কেউ কখনো করেনি। আমি বড়াই করছি না, শুধু আপনাদের বাস্তব তথ্যটিই বলছি। সম্ভবত কোনো প্রেসিডেন্টই কখনো কোনো যুদ্ধের নিষ্পত্তি করতে পারেননি। আমি আটটি যুদ্ধের নিষ্পত্তি করেছি।’
আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নুরেমবার্গ আদালতে একটি একাডেমিক ও আইনি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সময় নাভি পিল্লাই উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে কথা বলার সময় ট্রাম্পকে নিয়ে হাস্যরস করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের শেয়ার করা ভিডিও ফুটেজে এ দৃশ্য দেখা যায়।
করতালি-মুখর পরিবেশে কক্ষে প্রবেশের সময় নাভি পিল্লাই বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু জোরে হাততালি দেন, তবে আমি হয়তো ট্রাম্পের সঙ্গে এই পুরস্কারটি ভাগ করে নেব।’
গত বছর ভেনেজুয়েলার স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো গণতন্ত্র ও শান্তি কর্মী মারিয়া করিনা মাচাদোকে যখন এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উপেক্ষা করার ঘটনায় হোয়াইট হাউস তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। তারা নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে ‘শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার’ অভিযোগ তুলেছিল।
পরবর্তীতে নোবেলজয়ী মাচাদো প্রতীকীভাবে তার পুরস্কারটি ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তার অনন্য অঙ্গীকারের স্বীকৃতি’ হিসেবে দেওয়া হলো। এ বছর নোবেল কমিটি পুরস্কার ঘোষণার প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট চাপ সম্পর্কে সচেতন ছিল বলে মনে হয়েছে। তারা বলেছে, ‘আমরা লক্ষ্য করছি, আইনি কাঠামো এবং আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধাবোধকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। যখনই ন্যায়বিচারের ওপর গায়ের জোর বা শক্তি প্রাধান্য পায়, তখন তা স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করে।’
কমিটি আরও বলেছে, ‘এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চায়—শান্তি নিশ্চিতকরণ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে আমরা যে ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, তার মূল ভিত্তি হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের শাসন। আর শান্তির জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য।’
নোবেল কমিটির প্রধান ফ্রাইডনেস বলেন, ‘এর মাধ্যমে এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই একটি অধিকতর শান্তিপূর্ণ বিশ্বের মূল ভিত্তি। তাই অবশ্যই, আমরা আশা করি এই পুরস্কারটি শুধু নাভি পিল্লাইকেই নয়, বরং বিশেষ করে তাঁকে, প্রতিষ্ঠানগুলো ও লোকদেরকেও শক্তিশালী করবে।’
নাভি পিল্লাইয়ের কাজের মধ্যে রয়েছে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই করা। এ ছাড়া তিনি বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফৌজদারি মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন।
এ ছাড়া নাভি পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের একটি স্বাধীন কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তবে ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।