যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদ এবং তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের মধ্যে মার্কিন সিনেট বিতর্কের প্রথম প্রশ্নটি ছিল সেই বিষয়টি নিয়ে যা ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা হলো – অর্থনীতি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত রজার্সের সঙ্গে নিজের পার্থক্যের বিষয়টি আল-সায়েদ দ্রুতই তুলে ধরেন। তবে তা সুদের হার, কর বা বাণিজ্য নীতি সম্পর্কিত ছিল না; এটি ছিল ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধকে ঘিরে।
প্রগতিশীল এই ডেমোক্র্যাট বুধবার বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাসের দাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবকিছুর পেছনেই আসলে ইরানের এই যুদ্ধ দায়ী। আমাদের এখন একটি ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন বা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের এমন কোনো সিনেটরের প্রয়োজন নেই যিনি অযৌক্তিকভাবে শুরু হওয়া এবং বর্তমানেও পুরোপুরি অর্থহীন এই যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন।’ আট মাস ধরে চলা এই সংঘাত অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার আইনি চেষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করছিলেন আল-সায়েদ।
মিশিগানজুড়ে ডেমোক্র্যাটরা পেট্রোল ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জোর দিয়ে প্রচার করছেন।
এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স (আইজিএ)-এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জোনাথন গায়ার বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ এখন প্রতিটি পরিবারের নিত্যদিনের আলোচনার বিষয় (কিচেন টেবিল ইস্যু) হয়ে উঠেছে। ভোটাররা প্রায়শই পররাষ্ট্রনীতিকে তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন না, তবে আমি মনে করি এটি এখন অর্থনীতির সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে মূলত পররাষ্ট্রনীতিই এখন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।’
আইজিএ গত মাসে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা গেছে ৬০ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা ও পদক্ষেপের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রিপাবলিকানদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা একমত হয়েছেন যে, এই সংঘাতের কারণেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়
২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্যের প্রবাহ ব্যাহত করতে শুরু করে, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম গত কয়েক সপ্তাহে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশটিতে ভারী যন্ত্রপাতি চালনা এবং সারা দেশে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাকগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ডিজেল।
একইভাবে পেট্রোলের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। গ্যাস পাম্পে গিয়ে সাধারণ আমেরিকানরা প্রায় প্রতিদিন সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব টের পাচ্ছেন। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (এএএ)-র তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রতি গ্যালন (৩.৮ লিটার) পেট্রোলের গড় দাম ৩ ডলারের কম থাকলেও বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) তা বেড়ে ৪.২৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির এই প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়েছে, যা এমন এক সময়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা মার্কিন নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প এবং তার সহযোগীরা দাবি করে আসছেন যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখতে এই যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প নিজেই বারবার দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে মার্কিন হামলার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
সিনেট প্রার্থী রজার্স বুধবারের বিতর্কের সময় যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতি গ্যালন গ্যাসে ৮ ডলার দিতে চান, তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করতে দিন। তাহলে পুরো অঞ্চলের ওপর থেকে আপনাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে।’
একই সময়ে রজার্স সংঘাতের অবসানের আহ্বানও জানিয়েছেন। সম্প্রতি একটি মুদি দোকানে ধারণকৃত নির্বাচনি বিজ্ঞাপনে এই রিপাবলিকান প্রার্থী বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়া দরকার এবং তা দ্রুত শেষ হওয়া উচিত।’
প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ হাউজ ও সিনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অন্যান্য রিপাবলিকানদের বক্তব্যেও এই একই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রতিবেশী ওহিও রাজ্যে সিনেটর জন হাস্টেড যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আইওয়া রাজ্যে সিনেটের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কংগ্রেসওম্যান অ্যাশলি হিনসন জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পকে বলেছেন যেন সংঘাতের একটি তাৎক্ষণিক ও সফল সমাপ্তি টানা হয়। মেইন রাজ্যে সিনেটর সুসান কলিন্স একাধিক ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’-এর পক্ষে তার দেওয়া ভোটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
এতো কিছু সত্ত্বেও রিপাবলিকান পার্টির নেতা ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী মাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানের সঙ্গে আবার সর্বাত্মক লড়াই শুরু করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি এই যুদ্ধকে এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি এটি আমাদের করা সেরা কাজগুলোর একটি। আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া থেকে আটকে দিয়েছি। এটি আমাদের অন্যতম সেরা কাজ এবং এটি করতে প্রচুর সাহসের প্রয়োজন ছিল, কারণ অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট এটি করতে ইচ্ছুক ছিলেন না।’
‘মার্কিন অর্থনীতির মৃত্যুঘণ্টা’
যুদ্ধের সামগ্রিক অজনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বেশিরভাগ রিপাবলিকান এর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান উত্তরদাতা সংঘাত পরিচালনায় ট্রাম্পের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আগস্ট মাসে গৃহীত আইজিএ সমীক্ষায় এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪ শতাংশ। তবে মাত্র ৩৪ শতাংশ রিপাবলিকান উত্তরদাতা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন—যা এপ্রিলে ছিল ৪০ শতাংশ।
জোনাথন গায়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রিপাবলিকান ঘাঁটিতে যুদ্ধের প্রতি এই ধরনের জোরালো সমর্থনের অভাব আসন্ন নির্বাচনে দলটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, তবে তার প্রতি তাদের সমর্থনের তীব্রতা অনেক কমে গেছে। ভোটাররা যদি আসলেই ভোট দিতে আসেন এবং প্রচারণায় অংশ নেন, তবে এর একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।’
নির্বাচনের আর দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকা অবস্থায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন এবং দেশজুড়ে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের কোণঠাসা করতে তারা ক্রমাগত এই সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন।
বুধবার ডেট্রয়েটে আল-সায়েদের ডজন খানেক সমর্থকের উপস্থিতিতে আয়োজিত সিনেট বিতর্ক প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে আল জাজিরার পক্ষ থেকে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে ফেরা ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মারফির কাছে যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তার উত্তরটি অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি সম্পর্কিত না হয়ে পুরোটাই ছিল মার্কিন অর্থনীতি কেন্দ্রিক।
মারফি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ডেট্রয়েটে ডিজেলের দাম ইতোমধ্যেই গ্যালন প্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং এই যুদ্ধ আবার শুরু হলে তা আরও বাড়বে। মাইক রজার্স বিতর্কে বললেন যে, তিনি যুদ্ধকে সমর্থন করবেন, যা মূলত আমেরিকান অর্থনীতির জন্য একপ্রকার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সামিল। মিশিগানের ভোটারদের সামনে এখন একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আপনি যদি চান এই যুদ্ধ আরও এক বছর ধরে চলুক, আপনি যদি গ্যাসের দাম গ্যালন প্রতি ৮ ডলারে উঠুক তা চান, তবে মাইক রজার্সকে ভোট দিন। আর আপনি যদি যুদ্ধ বন্ধ করতে চান, পণ্যের দাম কমাতে চান, তবে আব্দুল আল-সায়েদকে ভোট দিন।’