ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৪০, জীবিতদের সন্ধানে তৎপর উদ্ধারকর্মীরা

ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপের উপকূলে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জীবিতদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এই ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

ভূমিকম্পের প্রথম ঘটনার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় হাজার কিলোমিটার দূরের সুমাত্রা দ্বীপে দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। তবে সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

উদ্ধার কর্মকর্তা ফাতুর রহমান জানিয়েছেন, আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) সন্ধ্যা নাগাদ ফ্লোরেস দ্বীপের ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার প্রধান সুহারিয়ান্তো এর আগে জানিয়েছিলেন, ধসে যাওয়া বেশ কয়েকটি ভবনের ভেতরে মানুষ আটকা পড়ে আছে।

সুহারিয়ান্তো বলেন, উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য হবে এই ভবনগুলো থেকে মানুষদের বের করে আনা। তিনি আরও জানান, উদ্ধার কাজে সহায়তার জন্য দুটি হেলিকপ্টার এবং একটি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে, ভূমিকম্পের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন সংস্থাটির কোপার্নিকাস আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তিনি লেখেন, ‘অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ইউরোপ তাদের মহাকাশের চোখ ‘কোপার্নিকাস’ মোতায়েন করতে প্রস্তুত। ইন্দোনেশিয়া, আমরা তোমাদের পাশে আছি।’

স্থানীয় সময় আজ শনিবার ভোরে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলের এই জনপ্রিয় পর্যটন দ্বীপে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানলে অনেক ঘরবাড়ি এবং বাণিজ্যিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুহারিয়ান্তো জানান, প্রায় দুই হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি পশ্চিমে অবস্থিত রুতেং শহরের বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জুলিয়ান জুইতা একালিয়া এএফপিকে বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো এত তীব্র ভূমিকম্প অনুভব করিনি।’

শনিবার ভোর সাড়ে ৫টায় কম্পনে ঘুম ভেঙে যাওয়া এই নারী বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো ট্র্যাম্পোলিনের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, দৃশ্যটা সত্যিই ভীষণ ভীতিকর ছিল।’

জুলিয়ান জুইতা আরও বলেন, ‘আমি যখন হন্তদন্ত হয়ে বাইরে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তখন ঘরের সব জিনিসপত্র নিচে পড়ে ভেঙে যাচ্ছিল—টেলিভিশন, আমার ছেলের ট্রফি, থালা-বাসনের র‍্যাক, আলমারির ওপর রাখা স্যুটকেস। বাইরে বেরিয়ে দেখি আমার ছেলে আর প্রতিবেশীরা আগেই সেখানে দাঁড়িয়ে ভয়ে চিৎকার করছে।’

উদ্ধার কর্মকর্তা ফাতুর এএফপিকে জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। তবে ভূমিধসের কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

এএফপির সাংবাদিকরা জানান, শনিবার ভোরের দিকে সমুদ্রের পানি নিচে সরে গেলে উৎপত্তিস্থলের কাছের এলাকা নাগেকেও-র বাসিন্দারা দ্রুত উঁচু স্থানের দিকে ছুটে যান—যা সাধারণত আসন্ন সুনামির একটি সম্ভাব্য লক্ষণ।

পরে সুনামির সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ লোকজনকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ আফটারশক (পরবর্তী কম্পন)-এর প্রভাবে ভবনগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফ্লোরেস দ্বীপে ডজন খানেক আফটারশক অনুভূত হওয়ার পর শত শত মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন। আফটারশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটির মাত্রা ছিল ৬.১।

ইন্দোনেশিয়ার ভূ-তাত্ত্বিক সংস্থা বিএমকেজি-র তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটির কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে ১.৬ মিটার (৫.২ ফুট) পর্যন্ত উঁচু ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *