দুটি যুদ্ধবিমান হারিয়ে ট্রাম্প-হেগসেথের দম্ভ চূর্ণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ছবি : এএফপি

ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে বেশ অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের বিষয়টি এখন একটি নতুন ধরনের এবং আরও সমস্যাসঙ্কুল ধাপে প্রবেশ করেছে। ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বরাবর বলে আসছিল আকাশপথে তারা ‘অপরাজেয়’। তবে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার খবরগুলো এখন তাদের সেই দম্ভোক্তিকে চূর্ণ করে দিয়েছে। খবর সিএনএনের।

যুদ্ধের বিষয়ে এখনো অনেক তথ্য মানুষের কাছে অজানা, যার মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমানে থাকা দুই বিমানসেনার বর্তমান অবস্থা। মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, তাদের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তবে অন্যজনের ভাগ্য সম্পর্কে এখনো কিছু জানা যায়নি।

এর পরপরই খবর আসে, শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ইরান দ্বিতীয় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানে আঘাত হেনেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, পাইলট বিমানটি থেকে নিজেকে ইজেক্ট করার আগে সেটিকে ইরানি সীমানার বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাকে উদ্ধারও করা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলোর অর্থ এই নয় যে, ইরান হঠাৎ করেই সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমান অবস্থানে চলে এসেছে। এখন পর্যন্ত মার্কিন হতাহতের সংখ্যাও সীমিত, যার মধ্যে গত তিন সপ্তাহে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে ইরান যুদ্ধ এমন একটি সংঘাত, যেখানে সামরিক আধিপত্যই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শক্তি, সেখানে এই ঘটনাগুলো অসম যুদ্ধের ঝুঁকির বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে—যে যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ নারাজ।

এই ঘটনাগুলো ইরানজুড়ে আকাশপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের করা দাবি এবং গত এক মাস ধরে তারা যে ‘অপরাজেয়’ ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এসব দাবি এর আগেও বেশ কয়েকবার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল, তবে এবারের ঘটনাটি একটি জোরালো দৃষ্টান্ত।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরানজুড়ে আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তারা দাবি করেছিলেন, তাদের যুদ্ধবিমানগুলোকে তেহরানের প্রতিহত করার কোনো ক্ষমতাই নেই। এক মাস আগে গত ৪ মার্চের এক ব্রিফিংয়ে পিট হেগসেথ বলেছিলেন, পূর্ণ আধিপত্য অর্জন করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

সেদিন হেগসেথ বলেছিলেন, ‘গত রাত থেকে অভিযান শুরু হয়েছে এবং কয়েক দিন বা এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি বিমান বাহিনী ইরানের আকাশপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে।’ তিনি একে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আকাশপথ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইরান এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও গত দুই সপ্তাহ ধরে এই আকাশপথের আধিপত্য নিয়ে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েছেন। গত ২৪ মার্চ তিনি বলেন, ‘আমাদের বিমান আক্ষরিক অর্থেই তেহরান এবং দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের ওপর দিয়ে উড়ছে, তারা এ বিষয়ে কিছুই করতে পারছে না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা করতে পারে এবং এক্ষেত্রেও তারা কিছুই করতে পারবে না।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ ধরে বলে আসছেন, ইরানের ‘কোনো নৌবাহিনী নেই,’ ‘কোনো সেনাবাহিনী নেই,’ ‘কোনো বিমান বাহিনী নেই’ এবং ‘কোনো বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা নেই।’ বুধবার রাতে হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের তেল স্থাপনাগুলোতে আঘাত করতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে ইরানিদের কিছুই করার থাকবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তাদের কোনো বিমান বিধ্বংসী সরঞ্জাম নেই। তাদের রাডার ব্যবস্থা ১০০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। সামরিক শক্তি হিসেবে আমরা অপ্রতিরোধ্য।’

এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, কয়েক হাজার যুদ্ধবিমানের মধ্যে মাত্র দুটি বিমান ভূপাতিত হয়েছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যেই জোর দিয়ে বলেছে যে, যুদ্ধে কিছু বিপত্তি বা প্রাণহানি ঘটতে পারে। হেগসেথ ৪ মার্চের একই ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেছিলেন যে, এমন পরিস্থিতি হতে পারে যেখানে কয়েকটি ড্রোন লক্ষ্যভেদ করতে পারে বা দুঃখজনক কিছু ঘটতে পারে।

কিন্তু আকাশপথে সামরিক আধিপত্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিগুলো ছিল চরম একপাক্ষিক। ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘অপরাজেয় আকাশপথ’-এর মতো শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তারা বোঝাতে চেয়েছেন যে ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রও নেই। এটি ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠদের সামরিক সাফল্যকে বাড়িয়ে বলার সর্বশেষ উদাহরণ মাত্র।

গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন যে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘নির্মূল’ করা হয়েছে এবং এটি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু মার্কিন প্রাথমিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে এমন কিছু পাওয়া যায়নি। এর ঠিক নয় মাস পর প্রশাসন হঠাৎ করেই ইরানকে আবার একটি আসন্ন পারমাণবিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ট্রাম্প একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছিলেন, যা পরে তদন্তে জানা যায়, ‘সম্ভবত’ যুক্তরাষ্ট্রের হামলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মাত্র একদিন আগে সিএনএন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, ইরানের মিসাইল লঞ্চার ধ্বংস করার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি ছিল অতিরঞ্জিত এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখনো তাদের সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক ধরে রেখেছে।

এই সবকিছুর মধ্যে রাজনৈতিক সমস্যা হলো, সামরিক সাফল্যই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের একমাত্র বড় প্রচারণার হাতিয়ার। মার্কিনিদের এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে খুব একটা আস্থা নেই। তারা মনে করে এর উদ্দেশ্য ঠিকমতো ব্যাখ্যা করা হয়নি। যুদ্ধের চারটি লক্ষ্যের তালিকা বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক হতাশা। মার্কিনিরা মনে করে না যে এই যুদ্ধ তার ব্যয়ের তুলনায় সার্থক।

এত কিছুর মধ্যেও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, মিডিয়া এই সামরিক অভিযানের সাফল্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। ৪ মার্চের সেই ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ফেক নিউজগুলো এখানেই ভুল করছে। আমরা কোনো স্থলবাহিনী ছাড়াই ইরানের আকাশপথ এবং জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি।’

তবে এক মাস পরে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি (হরমুজ প্রণালি) এখনো একটি বড় ব্যতিক্রম হিসেবে রয়ে গেছে। এছাড়া, ইরানের আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বিনাশের যে ‘বিজ্ঞাপন’ দেওয়া হয়েছিল, তা আদতে ততটা পূর্ণাঙ্গ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *